সঠিক তারিখ ও নির্ধারিত সময়ে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনের অপরিহার্যতা এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এদেশে প্রথম জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন কার্যকর হয় ১৮৭৩ সালে। কিন্তু এতে সফলতা না পাওয়ায় ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুযায়ী জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সব দেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম চালু থাকলেও আইনটি জারি হওয়ার দুই বছর পর ২০০৬ সালের ৩ জুলাই কার্যকর করা হয়। আইনটিকে অধিকতর জনবান্ধব করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ব্যাপকভাবে সংশোধন করা হয়।
এসব নিয়ে কাজ করা সিভিল রেজিস্ট্রেশন এবং ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (সিআরভিএস) বিশ্ব জুড়ে একটি চলমান, স্থায়ী এবং বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় সিআরভিএসকে শক্তিশালী করার জন্য বাংলাদেশ বিগত এক যুগ ধরে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সিআরভিএসের মূল উপাদানগুলো হচ্ছে জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন, মৃত্যুর অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয়, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও দত্তক গ্রহণ।
জন্মের সঠিক তারিখসংবলিত জন্মসনদ মানুষের সর্বজনীন অধিকার এবং পৃথিবীতে নিবন্ধিত মানুষ হিসেবে যেমন অত্যন্ত সম্মান বহনকারী একটি মূল্যবান দলিল, তেমনি কোনো ব্যক্তির একাধিক জন্মতারিখসংবলিত একাধিক জন্ম সনদ অত্যন্ত নিন্দনীয় বিষয়। প্রথম শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির বয়স সর্বোচ্চ ছয় বছর থাকায় নামিদামি স্কুলে ভর্তি ফরমের জন্য অনেক অভিভাবক সন্তানের একাধিক জন্ম সনদ পৃথক জন্ম তারিখ দিয়ে যে কোনো উপায়ে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। ফলে বিদ্যালয়ের একই শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করলে বয়সের তারতম্য সহজেই অনুমান করা যায়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য সব মানুষের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন অপরিহার্য। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সঠিকভাবে না হলে এবং মৃত্যুর অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা না হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। সিআরভিএস দশকের শেষ বছরে ২০২৪-এ বাংলাদেশে সকলের ১০০ ভাগ জন্ম নিবন্ধন এবং সকল মৃত্যুর ৫০ ভাগ নিবন্ধন সম্পন্ন করতে ইউনাইটেড ন্যাশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই লক্ষ্যে কাজ করলেও বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখ করার মতো নয়। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন ও বিধিতে জন্ম-মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধনের কথা থাকলেও এই সংখ্যা যথাক্রমে শতকরা প্রায় ৩ ভাগ ও ১ ভাগের নিচে।
বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ জন্ম নিবন্ধন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় হয়ে থাকে। ইউনিয়ন ও পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের নিবন্ধক হিসেবে কাজ করেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ায় তারা ইউনিয়ন ও পৌরসভার সচিব এবং অন্যান্য কর্মচারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। নিবন্ধকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মচারীদের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ও বিধিমালার প্রতি ব্যাপক অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে একই ব্যক্তির অনুকূলে একাধিক জন্মতারিখ-সংবলিত একাধিক জন্ম সনদ ইস্যু করতে দেখা যায়। স্থূল জন্মহার অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি বছর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে ২৭ লাখ শিশুর জন্ম এবং ৮ লাখ মানুষের মৃত্যুনিবন্ধন হওয়ার কথা থাকলেও বছরে প্রায় ৬০-৭০ লাখ মানুষের জন্মনিবন্ধন হয়, যা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিলম্বিত এবং একই ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধনের ফলে হয়ে থাকে। অন্যদিকে, মৃত্যুনিবন্ধন খুবই নগণ্য। প্রয়োজন ছাড়া জন্মনিবন্ধন হয় না বললেই চলে। অথচ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইনের ৬ ধারায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, নিবন্ধক সকল ব্যক্তির জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিত করবেন। একটি অপরিহার্য ও সহজ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে গুরুত্ব না দেওয়ায় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের প্রতিবেদন অনুযায়ী বছরে প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে ১৮টি শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং পাঁচ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ১ হাজার মানুষের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যুর এই হারকে যথাক্রমে স্থূল জন্ম ও মৃত্যুহার বলে। উক্ত তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২৭ লাখ জন্ম এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। বাংলাদেশে ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের অফিসের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। জনসংখ্যার ভিত্তিতে এত বেশিসংখ্যক নিবন্ধন কার্যালয় সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই।
প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেম্বার, সচিব, উদ্যোক্তা ও গ্রাম পুলিশসহ প্রায় ২০ জন এবং পৌরসভায় আরো অধিকসংখ্যক জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। দিনে এক-দুইটি জন্মনিবন্ধন এবং দুই দিনে একটি মৃত্যুনিবন্ধন করলে তারা হেসে-খেলে শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করতে পারবেন। যেহেতু আইনানুযায়ী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কাজটি প্রায় শতভাগ ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে সম্পন্ন করতে হয়, তাই ইউনিয়ন ও পৌরসভাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় কখনোই সুষ্ঠুভাবে আইনানুযায়ী শতভাগ জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা সম্ভব হবে না।
n লেখক :কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর, সিআরভিএস, সাবেক অতিরিক্ত সচিব
