সমাজের কিছুসংখ্যক সিনিয়র সিটিজেনের সমন্বয়ে গঠিত পর্যটনবিষয়ক বেসরকারি সেবামূলক সংস্থা ‘কাছে এসো’র উদ্যোগে আমরা প্রায়শই বিভিন্ন জেলা শহরে ট্যুর প্রোগ্রাম আয়োজন করে থাকি। বিশেষ করে ঐতিহাসিক স্থানসমূহ পরিদর্শন করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই ধারাবাহিকতায় গত বছর (২০১৯) বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক মুজিবনগর দর্শন করার জন্য আমরা মেহেরপুর ভ্রমণে গিয়েছিলাম। মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে জেলার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সাক্ষাত্কার গ্রহণ করি। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বর্তমান সরকারের আমলে মেহেরপুর জেলার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। তিনি জানালেন, আগে মেহেরপুর অত্যন্ত দরিদ্র ও পশ্চাত্পদ একটি জনপদ ছিল। বর্তমান সরকার আমলে মেহেরপুর জেলার উন্নয়নে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মেহেরপুর জেলার আর্থসামাজিক চিত্র পালটে যেতে শুরু করেছে। এখন এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়েছে। তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি ছোট ছোট শিল্পকারখানা গড়ে তুলছে। পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। আমরা মেহেরপুর পরিদর্শনকালে তার বক্তব্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। রাস্তার পাশে প্রতিটি বাড়িতেই ছাগল বা গরুর খামার লক্ষ করি।
মেহেরপুর ভ্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ আমঝুপি নীলকুঠি পরিদর্শন করি। উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘ব্রিটিশ আমলে নীল চাষের উদ্দেশ্যে ইংরেজরা ৭৪ একর জমির ওপর ঐতিহাসিক আমঝুপি নীলকুঠি গড়ে তোলে। মেহেরপুর অঞ্চলে ১৭৭৮ সালে ক্যারল ব্লুম নামে এক ইংরেজ ব্যক্তি তত্কালীন নদীয়া জেলা বর্তমানে মেহেরপুরের আমঝুপির কাজলা নদীর তীরে ৩০০ বিঘা জমির ওপর নীলকুঠি স্থাপন করেন। নীল চাষ অত্যধিক লাভজনক হওয়ায় ১৭৯৬ সালে এখানে নীল চাষ শুরু হয়। এ সময় বিখ্যাত বর্গি দস্যু নেতা রঘুনাথ ঘোষালীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে গোয়ালা চৌধুরী নিহত হলে মেহেরপুর অঞ্চলে রানি ভবানীর জমিদারিভুক্ত হয়। রানি ভবানী নিহত হওয়ার পর হাত বদল হয়ে গোটা অঞ্চলটি মথুরানাথ মুখার্জির জমিদারিভুক্ত হয়। পরে তার ছেলে চন্দ্রমোহন বৃহত্ অঙ্কের টাকা নজরানা নিয়ে মেহেরপুরকে জেমস হিলের হাতে তুলে দেন। ১৮১৮ থেকে ১৮২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মেহেরপুরের বেশ কয়েকটি স্থানে নীলকুঠি স্থাপিত হয়। তন্মধ্যে আমঝুপি, গাংনীর ভাটপাড়া, বামন্দি নীলকুঠি অন্যতম। কথিত আছে, রবাট ক্লাইভ প্রায়ই সময় কাটানোর জন্য আমঝুপি নীলকুঠিতে আসতেন। নীলকুঠিতে তার ব্যবহার্য সামগ্রীও ছিল, যা সংরক্ষণের জন্য জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
এই ঐতিহাসিক বর্ণনা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই নীলকুঠি ১৭৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। লর্ড ক্লাইভ প্রায়শই এখানে অবসর সময় কাটানোর জন্য আসতেন। স্থানীয়ভাবে অনেকেই বলেছেন, পলাশীর যুদ্ধের কিছুদিন আগেও বরার্ট ক্লাইভ এখানে এসেছিলেন ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার জন্য। কিন্তু এই বক্তব্য মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, বর্ণনা মোতাবেক আমঝুপি নীলকুঠি স্থাপিত হয় পলাশীর যুদ্ধের ২১ বছর পর। রবার্ট ক্লাইভ এর অনেক আগেই ইংল্যান্ড চলে গিয়েছিলেন। ক্লাইভ ২২ নভেম্বর, ১৭৭৪ তারিখে ইংল্যান্ডে আত্মহত্যা করেন। যিনি ১৭৭৪ সালে মারা গেলেন তার পক্ষে কি ১৭৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নীলকুঠিতে আসা সম্ভব? কাজেই এই বর্ণনা মোটেও সত্যি বা বাস্তবসম্মত নয়। আমঝুপি নীলকুঠি ভবনটি দেখতে বেশ সুন্দর। এখনো জীবন্ত মনে হয়।
পরদিন সকাল বেলা আমরা উদ্দিষ্ট স্থান অর্থাত্ স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐহািসিক মুজিবনগর আম্রকানন যাই, যেখানে স্বাধীন বাংলার প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। আমরা এখানে স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা এবং ভাস্কর্য পরিদর্শন করি। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, এখানে একটি ভাস্কর্যের পরিচিতিতে মারাত্মক বিভ্রান্তি ঘটেছে। জাতীয় চার নেতার পাশাপাশি খন্দকার মুশতাক আহমেদ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। ভাস্কর্যের বাঁ দিক থেকে পর্যায়ক্রমে রয়েছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মুশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এম এ জি ওসমানি। কিন্তু অনার বোর্ডে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর নামের স্থলে এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানের নামের স্থলে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর নাম লেখা হয়েছে। যারা চার জাতীয় নেতা এবং খন্দকার মুশতাক আহমেদ ও এম এ জি ওসমানীর অবয়ব ভালোভাবে চেনেন, তারা এই বিভ্রান্তি খুব সহজেই ধরতে পারবেন। কিন্তু যারা এদের সম্পর্কে অবহিত নন, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এবং বিদেশি পর্যটক, তারা নিশ্চিতভাবেই বিভ্রান্ত হবেন। কত গুণীজন প্রতিনিয়ত মুজিবনগর সফর করেন কিন্তু কেউই এই বিভ্রান্তি দূর করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এখানে ভাস্কর্য পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু অনার বোর্ড পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই কাজটি কেউই করছেন না। জাতীয় ইতিহাস বিকৃত করার এই ধৃষ্টতা কীভাবে চলছে? বিষয়টি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুব কষ্ট দিয়েছে। ফিরতি পথে আমি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে তাকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি অচিরেই এই বিভ্রান্তি দূর করার উদ্যোগ নেব।’ কিন্তু এক বছর গত হলেও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে কোনো কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তিনি তার কথা রাখেননি। আমি কিছু দিন আগে স্থানীয় একজন সমাজকর্মীকে বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য অনুরোধ করলে তিনি মুজিবনগর গিয়ে দেখতে পান অনার বোর্ড আগের মতোই আছে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি আশা করব, কর্তৃপক্ষ অচিরেই বিষয়টি নিয়ে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং যারা এই মারাত্মক ভুল করেছেন তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসবেন।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক
