প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু ভবন থেকে ৮০ কেজি ওজনের মানুষ নিচে ড্রেনের স্লাবের ওপর পড়ে যাওয়ার পর শরীরের একটি হাড়গোড়ও ভাঙেনি। শরীরের কোথাও জখমের চিহ্ন তো নেই, এক ফোঁটা রক্তও ঝরেনি। উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে যাওয়া ব্যক্তি মারা গেলেও পুলিশ বলছে, ঐ ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছেন। চার তলা ভবনের ছাদে পানির ট্যাংকে পানি প্রবেশের লোহার পাইপের সঙ্গে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গলায় নাইলনের রশি ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করার সময় রশি ছিঁড়ে ভবন লাগোয়া ড্রেনের পাশে পড়ে মারা যান। এমন ঘটনায় পুলিশ রাজধানীর মগবাজারে বিটিসিএল কলোনিতে উপ-সহকারী প্রকৌশলী আতফাবুল ইসলাম সুমনের মৃত্যুর বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে।
সুমনের পরিবার ও তার সহকর্মীদের দাবি, সুমন আত্মহত্যা করবেন বা তিনি আত্মহত্যা করার মানুষ নন। তাদের ধারণা, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয় ড্রেনের স্লাবের ওপর।
গত ২৮ ডিসেম্বর মগবাজার টিঅ্যান্ডটি কলোনির এফ/৬/৮ নম্বর ভবনের পাশে থেকে আতফাবুল ইসলাম সুমনের (৪৮) লাশ উদ্ধার হয়। এসময় তার গলায় লাল রঙের নাইলনের রশি প্যাঁচানো ছিল। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঐ ভবনের চারতলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ভবনের ছাদে গিয়ে দেখতে পায় যে পানির ট্যাংকের লোহার পাইপের সঙ্গে দুই হাত দৈর্ঘ্যের লাল রঙের নাইলনের দড়ি বাঁধা রয়েছে। লাশের গলায় প্যাঁচানো দড়ির সঙ্গে পানির ট্যাংকের লোহার পাইপের ঝুলানো খণ্ডিত দড়ির সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। এটা থেকে পুলিশ ধারণা করে যে, সুমন ভবনের ছাদে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু দেহের ওজনে দড়িটি ছিঁড়ে যায়। এতে নিচে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
সুমনের স্ত্রী ফারজানা ইয়াসমিন শান্তা বলেন, সুমনের সঙ্গে দীর্ঘ ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবন সুখেই কাটছিল। কখনো তেমন বড় ঝগড়াঝাটি হয়নি। সুমন নামাজ, মসজিদ ও কাজ ছাড়া বাইরে কোনো বাজে আড্ডায় অংশ নিতেন না। তিনি কেন আত্মহত্যা করতে যাবেন? সুমনকে হত্যার পর ‘আত্মহত্যার নাটক’ সাজানো হয়েছে।
ঘটনার দিনের তথ্য দিয়ে ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, ২৮ ডিসেম্বর ভোরে বিটিসিএল কলোনি জামে মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য তার স্বামী বাসা থেকে বের হন। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাসার পাশেই ড্রেনে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে আশপাশের লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। এসময় লাশের মুখে নতুন একটি সার্জিক্যাল মাস্ক লাগানো ছিল। গলায় বাঁধা ছিল লাল রঙের নাইলনের রশি।
লাশ উদ্বারের সময় সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন হাতিরঝিল থানার এসআই শরিফুল ইসলাম। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘গলায় নাইলনের লাল রশি লাগিয়ে চারতলা বিল্ডিংয়ের ছাদের ওপর পানির পাইপের সঙ্গে বেঁধে নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
ওসি আব্দুর রশিদ বলেন, লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা হত্যার কোনো অভিযোগ করেননি। এ কারণে পুলিশই বাদী হয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে। ঘটনার তিন-চার দিন পর পরিবারের সদস্যরা হত্যার অভিযোগ করেন। তখন তাদেরকে বলা হয়েছে যে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
ওসি আরো বলেন, সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে ঐ দিন প্রকৌশলী সুমন মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়া এবং বাসায় প্রবেশের দৃশ্য দেখা গেছে। তাহলে তাকে হত্যা করা হলো কীভাবে? ছাদের যে স্থান থেকে আত্মহত্যা করেছেন, ঠিক তার বরাবর নিচের স্থান থেকে আমরা লাশ উদ্ধার করেছি। লাশ পড়ার সময় ড্রেনের ওপর পড়েনি। ড্রেনের পাশে শেওলাযুক্ত নরম মাটিতে লাশটি পড়েছিল। এ কারণে তার শরীরের কোনো আঘাতের চিহ্ন বা রক্ত ঝরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশের সঙ্গে ছিলেন বিটিসিএলের কার্পেন্টার ও সুমনের প্রতিবেশী আবুল কাশেম। তিনি বলেন, ‘সুমনের মুখে মাস্ক পরা ছিল। মাস্কটি ছিল একদম পরিষ্কার ও নতুন। সুমন যদি আত্মহত্যা করে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই তার মুখে মাস্ক থাকার কথা নয়। আবার নিচে পড়ে গিয়ে মাস্কে ময়লাযুক্ত দাগ পড়ত। তাছাড়া প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু ভবন থেকে পড়েছে কেউ কোনো শব্দ শুনতে পায়নি। তার শরীরের একটি হাড়ও ভাঙেনি। হাত-পা সব অক্ষত। পাকা ড্রেনের পাশে পড়েও তার মাথা ফাটেনি। শরীরের কোথায় জখম হয়নি—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমার ধারণা, তাকে অন্য কোথাও হত্যা করে এখানে লাশ ফেলে যাওয়া হয়েছে।
মগবাজার টিঅ্যাডটি কলোনির এফ/৬/৮ নম্বর ভবনের বাসিন্দা রাবেয়া জানান, ‘আমি নিজেও ফজরের নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াত করি। চারতলা থেকে প্রায় ৮০ কেজি ওজনের একজন মানুষ পড়লে যে শব্দ হবে এরকম কোনো শব্দ আমাদের কানে আসেনি। তাছাড়া এরকম শব্দ হলে আমি নয়, আশপাশের বাসিন্দাদের কেউ না কেউ শুনতে পেতেন। কেউই শোনেননি পড়ে যাওয়ার শব্দ। পুলিশ আত্মহত্যার কথা বললেও আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।’
