এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০১

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করে বাংলাদেশ আগামী ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে এমন একটি সময়ে, যখন কোভিড-১৯ মহামারির আক্রমণে বাংলাদেশসহ এখন পর্যন্ত প্রায় আট হাজারের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ১ কোটি ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে, যাদেরকে পুনর্বাসন করা এখন সময়ের দাবি। সরকার এরই মধ্যে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা প্রণোদনা হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে, যা জিডিপির ৪.৪৪ শতাংশ। সে যা-ই হোক না কেন বর্তমান (২০২০-২১) বছরে ঘোষিত বাজেটকে বলা হয় করোনাকালের বাজেট, যেখানে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও খেলাপি ঋণের সংকট, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় জীবন-জীবিকা সুরক্ষা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং বিদেশের বাজারে তেলসহ পণ্যের কেনাবেচা ইত্যাদি অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে বর্তমান বছরের পাঁচ মাসে উন্নয়ন খাতের বাজেট ব্যয়ের গতি-প্রকৃতির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করাই এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য। সরকারের বাজেট কাঠামোতে উন্নয়ন বাজেট তথা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং বর্তমান অর্থবছরের বাস্তবায়িত বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা ১ হাজার ৫৮৪টি প্রকল্পে এ অর্থ ব্যয় হবে। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি ও বৈদেশিক উত্স থেকে ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকার সংস্থান করা হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এডিপির আওতায় বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ৪৫৬টি, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১২৭টি ও জেডিসিএফ অর্থায়িত প্রকল্প একটি। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের প্রকল্পে প্রায় ৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ রয়েছে। এ অর্থের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স ৫ হাজার ৫৭৮ কোটি ও বৈদেশিক উত্স ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। ফলে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের ব্যয় ও প্রকল্প যুক্ত করলেও মোট প্রকল্প দাঁড়াবে ১ হাজার ৬৭৩টি এবং এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় চারটি কৌশলের কথা বলেছিলেন। যেমন—সব ব্যয়ে কর্ম সৃজনকে অগ্রাধিকার ও বিলাশী খরচ কমানো, ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে কতিপয় সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি ও বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি। মুজিববর্ষে সরকারের বিশেষ উপহার পাঁচ বছর পর কর মুক্ত আয়সীমা যেমন বাড়িয়েছে তেমনি আয় করের হারও কমিয়েছে।

সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যায় যে, বর্তমান অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন যেখানে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১৭.৯৩ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯.২৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে বাস্তবায়নের পরিমাণও কমেছে প্রায় ২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা (উত্স: পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ)। এই বিভাগের তথ্যে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৮ হাজার ৪৭৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা গত অর্থবছরে ছিল ৪১ হাজার ৩৮৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৩৬ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ৩২ হাজার ৯৯৭ কোটি ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। স্বাধীনতার এত বছর পরও এ কথা কোনোভাবেই বলা যাবে না যে, কেবল নির্বাচনি বছর ছাড়া এডিপি-এর বাস্তবায়ন ৯০ শতাংশ ওপরে পৌঁছেছে, যার প্রমাণ অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষ (২০২০)।

আলোচিত বছরে করোনাকালীন বাজেট বাস্তবায়নের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন কেন্দ্রিক রাজস্ব আহরণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অগ্রধিকারভিত্তিক সরকারি ব্যয় নির্ধারণ, ঘাটতি বাজেটের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি ঋণের প্রতিবন্ধকতা, রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্যে সমতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সঞ্চয় বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি যা একেবারেই দৃশ্যমান। তাই এডিপি বাস্তবায়নে সক্ষমতার রোড ম্যাপ তৈরি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, প্রকল্পের গুণগত বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করলে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এখন প্রশ্নটি হলো, তা কীভাবে সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তার বাজেট সমাপনী বক্তৃতায় মহান জাতীয় সংসদে বলেছেন করোনা মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং অর্থমন্ত্রী বলেছেন অর্থের কোনো রকম অভাব হবে না। এ ব্যাপারে বেশ কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। যেমন—প্রথমত, চলতি বছরের এডিপিতে তালিকাভুক্ত সম্ভাব্য কোনো প্রকল্প আগামী অর্থবছরের এডিপির জন্য প্রস্তাব করা যাবে না; দ্বিতীয়ত ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুন মেয়াদে উত্তীর্ণ কোনো প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধি ছাড়া নতুন এডিপিতে যুক্ত করা যাবে না; তৃতীয়ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ নিরুত্সাহিত করা হয়েছে চলমান এডিপিতে এবং প্রকল্প যথাসময়ে সমাপ্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; চতুর্থত, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন প্রকল্প বর্তমান অর্থবছরের এডিপিতে সয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে না; পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ সংক্রান্ত নদীভাঙন, নদী ড্রেজিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্প অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে; সর্বশেষ—জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সাহায্যপূর্ণ বর্তমান অর্থবছরের সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত এবং দ্রুত অগ্রগতি সম্পন্ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে চলতি প্রকল্পগুলোর সর্বশেষ অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় এবং ক্রমপুঁজিগত অগ্রগতি ব্যয়ের ভিত্তিতে সম্ভাব্য যৌক্তিক ব্যয় বিবেচনায় আগামী বছরে এডিপিতে বরাদ্দ প্রস্তাব করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং এর জন্য সরকারের বাজেটে উল্লিখিত রাজস্ব আদায়ের টার্গেট শতভাগ অর্জন করতে হবে। অপর দিকে ঘাটতি বাজেটের আকার কমাতে হবে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণে রাজস্ব ঘাটতি ছিল, শেষ তিন মাসে তা বেড়ে দ্বিগুণ দাঁড়িয়েছে। ভ্যাট আদায়ে সক্রিয়তা দেখানো হলেও ভ্যাটেও সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে এনবিআর। আলোচ্য সময়ে এনবিআরের ভ্যাটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৪০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। ভ্যাটে প্রবৃদ্ধি মাইনাস ৩.৩৬ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানিতে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা, আর আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা, আমদানি-রপ্তানিতে ঘাটতি ১২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। আয়করে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। অর্থাত্ আয়কর খাতে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করোনাকালে রাজস্ব আদায়ের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা ঘাটতির বড় কারণ। এনবিআরের অটোমেশনসহ ভ্যাট আদায়ে নানা জটিলতা রয়েছে। করদাতাদের হয়রানিসহ নানা কারণে রাজস্ব আদায়ের গতি শ্লথ হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো—রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বাজার অর্থনীতির যুগে পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা থাকে খুবই গৌন। এ আওতায় উন্নয়ন প্রকল্পের বাজার হলো পরিকল্পনা কমিশন যেখানে ক্রেতার ভূমিকায় প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের আওতায় উদ্যোগী সংস্থা ও বিক্রেতার ভূমিকায় সরকার নিজেই। এখন ক্রেতা হিসাবে উদ্যোগী সংস্থা তার পণ্য বা সেবা সাধারণ সুফলভোগীদের হাতে তুলে দিবে সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যে যা প্রকল্প ছকে উল্লেখ রয়েছে। সেই জায়গাটিতেই প্রশ্ন আসে ব্যয় দক্ষতা, জবাবদিহিতা, সুশাসনসহ পরিবীক্ষণের বিষয়টি যার ঘাটতি বিদ্যমান। তাই বাজেটে এগুলো দূরীকরণে পর্যাপ্ত বাজেট ব্যবস্থা থাকতে হবে বিশেষত প্রশিক্ষণ আয়োজনে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের জন্য যার সঙ্গে দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি জড়িত। কারণ, দক্ষ ও নৈতিকভাবে সবল জনশক্তিই কেবল শতভাগ প্রকল্প টার্গেট অর্জন করতে সক্ষম।

n লেখক :গবেষক ও অধ্যাপক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।