সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা ফাইনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হলে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পূর্বেই বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ লাভ করেন। কিন্তু গত শিক্ষাবর্ষে, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্মান চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা নিয়ে বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তাদের কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর সুপারিশে পিএসসিও বিসিএস এ আবেদনের সময়সীমা দুই মাস বৃদ্ধি করে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বর্ষের শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তা লাঘব হলেও কপালে ভাঁজ পড়েছে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘদিনের ছুটির ফলে বড় ধরনের সেশনজটে পড়তে হতে পারে তাদের। এখনো পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আবার, চাইলেও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব নয়, রয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল খোলারও চ্যালেঞ্জ। এতসব বিবেচনায় শিক্ষার্থীরা সেশনজটেরই আশঙ্কা করছেন।
সচরাচর ডিসেম্ব্বর কিংবা জানুয়ারির মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও পুরোনো বর্ষের পরীক্ষার ধাপ এখনো পেরোতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। সেমিস্টার সিস্টেমের কারণে দুইটা সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা জমে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা এবং দুই সেমিস্টারের পরীক্ষা গ্রহণ সময়সাপেক্ষ একটি ব্যাপার। আবার সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথাও ভাবতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। এভাবে একটি শিক্ষাবর্ষ দীর্ঘায়িত হয়ে সেশনজটের ভয়কে আরো বাড়িয়ে তুলছে। অনলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ করার কথা উঠলেও বাস্তবে সেটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় সত্তর ভাগেরই বসবাস গ্রামাঞ্চলে। অনলাইনে জুম বা গুগল মিটের মাধ্যমে তিন ঘণ্টার পরীক্ষা নেওয়া তাই সহজসাধ্য নয়। নেটওয়ার্ক, লোডশেডিং, প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্য এক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করবে। তাই অল্প নম্ব্বরের কিছু পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়া সম্ভব হলেও পূর্ণ নম্ব্বরের পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে পরীক্ষা না নেওয়ার ফলে সেশনজটও একটু একটু করে বাড়ছে। বলা যায়, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উভয়ই এক ধরনের দোটানার মধ্যে পড়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়ার সঙ্গে যেহেতু হল খুলে দেওয়ারও সম্পর্ক রয়েছে, তাই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে হল খুলে দেওয়া বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ। কবে নাগাদ করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, সেটি নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে দেশে করোনার ভ্যাকসিন ইতিমধ্যেই চলে আসায় ধারণা করা যায়, কয়েক সপ্তাহের ভেতরেই করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে আরো অনেক বিষয় সংশ্লিষ্ট। তাই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অপেক্ষা না করে কীভাবে সেশনজট নিরসন করা যায়, সেদিকে মনোনিবেশ করাটাই বেশি জরুরি বলে মনে করি। এক্ষেত্রে তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর জন্য অ্যাসাইনমেন্টের পাশাপাশি প্রায়োগিক প্রশ্নের উত্তর, গবেষণা কিংবা জরিপ নির্ভর উত্তর, কেইস অ্যানালাইসিস, বিজনেস মডেল বা প্রোজেক্ট সাবমিশনের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। এই পদ্ধতিতে উত্তরপত্র জমাদানের পদ্ধতি ও সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা অবলম্ব্বন করা প্রয়োজন। আবার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই প্রতিযোগিতাগুলোর মূল্যায়ন পদ্ধতিও এক্ষেত্রে অনুসরণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পূর্বেই সামগ্রিক মূল্যায়নের একটি বড় অংশ সম্পন্ন করা যাবে; যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাবহারিক ও অন্যান্য বিষয়াবলির মূল্যায়ন দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে। এছাড়াও শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে ভিন্ন পদ্ধতিতেও সেশনজট এড়ানোর জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নিরসনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী—এই তিন পক্ষকেই আন্তরিক ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখতে হবে। সেই সঙ্গে এটিও মাথায় রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতা দেশের জন্য অকল্যাণ ছাড়া কিছুই বয়ে আনতে পারে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনসিওরেন্স বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
