যারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করার পর অন্য কোনো দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আর্থিক সচ্ছলতা অথবা উন্নত জীবনযাপন করার জন্য তাদেরকে প্রবাসী বাংলাদেশি বলা হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মানুষ প্রবাসে পাড়ি জমান ভালো পরিবেশে বসবাস করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বা বলা যেতে পারে পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় উন্নত পড়াশুনার জন্যও এদেশ থেকে অনেক মেধাবী সন্তানেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়ে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা আর সেখান থেকে ফিরে আসেন না। বাংলাদেশে আসেন কেবল বেড়াতে কিছুদিনের জন্য। তারা উন্নত রাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিক হিসেবেই বসবাস করে থাকেন। এতে করে দেশ হারাচ্ছে মেধাবী সন্তানদের।
নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির বেশির ভাগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বসবাস করে তাদের সংখ্যা প্রায় ১.২ মিলিয়ন। সৌদি আরব ছাড়াও আরব বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে যেমন :সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও বাহরাইনে প্রচুর পরিমাণে বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করে। সেখানে বাংলাদেশিদের বিদেশি কর্মী হিসেবে ধরা হয়। তাদের বেশির ভাগই স্বল্প আয়ের নাগরিক।
প্রবাসে কর্মরত নাগরিকদের স্বদেশের প্রেরিত অর্থকে রেমিট্যান্স বলে। তাদের অর্জিত অর্থের একটা অংশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিবারের কাছে পাঠায়। এই অর্থ কেবল তাদের পরিবারের প্রয়োজনই মেটায় না, তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে এবং নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো দেশের প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। তাই হলফ করে বলা যায়, এই রেমিট্যান্স থেকে সেই প্রবাসী কর্মজীবীর পরিবার এবং দেশ উভয়েই লাভবান হয়।
নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যারা শুধু টাকা উপার্জনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়ে থাকেন তাদেরকে কাটাতে হয় দুর্বিষহ সময়। তারাই কেবল বুঝবে প্রবাস জীবন আসলে কতটা কষ্টের। বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর। বিদেশে থাকা মানেই মানুষ মনে করে রঙিন দুনিয়া। নানা রকম বায়না ধরে কী কী এনেছে! কাকে কতটুকু কী দিয়েছে! সবাইকে খুশি করা যে কতটা কষ্টের তা কেউ বুঝতে চেষ্টাও করেন না।
এক বার দেশে এসে ফিরে গেলে দেখা যায় তার প্রিয় সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার ছবিটি কেবল ভিডিও কলেই দেখে। এমনো চিত্র দেখেছি সন্তান জন্মের পর ছয়/সাত বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও সন্তান তার বাবার আদুরে স্পর্শটুকু পায়নি। দেখা যায়, বিয়ে করে চলে যায় আর ফিরে আসার ব্যাকুলতা কেবল দীর্ঘশ্বাসে রূপ নেয়। তারা এতটা অভাগা যে নিকট-আত্মীয় বা মা-বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে থাকে তবে তাদের ছুঁয়ে শেষ বিদায় জানাতে পারেন না। ভাইবোন নিকট-আত্মীয় সবার কথা প্রতিনিয়ত তাদের ভাবনার মধ্যে আসে। নাড়ির টান অনুভব করে দেশকে ছেড়ে আসার পেছনের গল্পটা তো নির্মম। কিছুই করার থাকে না। দেশে পড়ে থাকা পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তো তাদেরকেই ব্যবস্থা করতে হয়। তাছাড়া তো তাদের আর কোনো উপায় নেই। প্রবাসীকে অবশ্যই আমাদের সম্মানের চোখে দেখা উচিত। কারণ তারা নির্মম বাস্তবতার কাছে হার মানা সৈনিক।
প্রবাসী জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকা যেমন কষ্টকর ঠিক তেমনিভাবে মারা যাওয়ার পর তাদের লাশটিও যেন কখনো কখনো বোঝা হয়ে দাঁড়ায় অসচ্ছল পরিবারের জন্য। লাশ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে যে ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় তা সীমাহীন কষ্টের। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পরিবার এতটা অসচ্ছল তারা লাশ আনার যে খরচ তা নিতে চায়, কিন্তু লাশটি নয়। তারা চিন্তা করে অসচ্ছল পরিবারে কিছুদিন তো কাটাতে পারবে এই টাকা দিয়ে। নিষ্ঠুর পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ছবি কেবল তারাই দেখে যারা নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত। প্রবাস জীবনের নির্মম কাহিনি তাদের মুখের ম্লান হাসিটার আড়ালের সুখ-দুঃখের সাতকাহন অনেকের কাছে অজানাই থেকে যায়।
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ
