বগুড়ার উডবার্ন সরকারি গ্রন্থাগার
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় বগুড়া উডবার্ন সরকারি গ্রন্থাগারের ৩০০ বছরের পুরোনো বেশ কয়েকটি পাণ্ডুলিপিসহ মূল্যবান অনেক বই সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। তত্কালীন ব্রিটিশ গভর্নর জন উডবার্ন ১৮৫৪ সালে উত্তরাঞ্চলের রংপুর, বগুড়া এবং দক্ষিণাঞ্চলের যশোর ও বরিশাল জেলায় ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে চারটি গ্রন্থাগার স্থাপন করে। এর মধ্যে বগুড়ায় উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি নামে একটি লাইব্রেরি স্থাপন কর হয়। বগুড়ার উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে যেসব বই স্থান পায়, তার মধ্যে ১৮৪২ সালে ছাপানো উইলিয়াম স্মিথের লেখা ‘গ্রিক এ-রোমান অ্যানটিকিউলিটিস’ একটি উল্লেখযোগ্য বই। এছাড়া ‘স্ট্যাটিসটিক বগুড়া ১৯১১’, ই. জেইটের লেখা ১৯২৬ সালে ছাপানো ‘হিস্টোরি অব আসাম’, শ্রী প্রভাস চন্দ্র সেন বিএলের লেখা ১৯২৯ সালে ছাপানো ‘বগুড়ার ইতিহাস’সহ আছে আরো অনেক পুরোনো বই।
বগুড়ার উডবার্ন সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. আমির হোসেন জানান, উডবার্ন সরকারি গণগ্রন্থাগারে রয়েছে ৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো পুঁথির পাণ্ডুলিপি, ‘প্রাচীন পদ্মপূরাণ’, ‘গোবিন্দ কথামৃত’, ‘হিরন্যকাশিপুর পুঁথি’র পাশাপাশি আছে দুষ্প্রাপ্য বইও। কিন্তু এসব মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য বেশ কয়েকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরে। তিনি জানান, তুলট কাগজে ১৪ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও ৩ ইঞ্চি প্রস্থের দেবী মনসার প্রশংসা করে লেখা ৮০০ পৃষ্ঠার ‘প্রাচীন পদ্মপূরাণ’ ইতিমধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর রাজা গৌড় গোবিন্দের গুণকীর্তন করে ১ হাজার পৃষ্ঠার সুবৃহত্ পুঁথি ‘গোবিন্দ কথামৃত’ আর ভারতের মেদিনীপুর জেলার হিরন্যকাশিপুরের গুণবর্ণনা সংবলিত ৭০০ পৃষ্ঠার ‘হিরন্যকাশিপুর পুঁথি’র অবস্থাও একই রকম। প্রাকৃত, পালি ও সংস্কৃত ভাষায় লেখা এই পুঁথিগুলোর রচয়িতা শ্রী ভগবত জ্ঞানেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য। তিনি রাজকবি ছিলেন। উপমহাদেশের আর কোথাও এসব পুঁথির অস্তিত্বের কথা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। রচনার সময়কাল বিচারেও এসব পুঁথি দুষ্প্রাপ্য ও মহামূল্যবান। কিন্তু উডবার্ন লাইব্রেরির মূল্যবান এই পুঁথিগুলোর কোনোটিরই সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ কখনোই নেওয়া হয়নি। গবেষকদের জন্য এই পুঁথি নিঃসন্দেহে মূল্যবান, পুঁথিগুলোর পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হলে রচনার সময়কাল কিংবা এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে এ ধরনের প্রাচীন পুঁথি যে কোনো জাতির জন্যও অমূল্য সম্পদ। পুঁথিগুলো কীভাবে পাওয়া গেল—এ প্রশ্নের জবাবে সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. আমির হোসেন জানান, ২০১৩ সালে উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি বগুড়া উডবার্ন সরকারি গণগ্রন্থাগারে একীভূত হওয়ার পর অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে পুঁথির পাণ্ডুলিপিগুলো এ লাইব্রেরিতে আনা হয়। তিনি জানান, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই শরত্ চন্দ্র বসু, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কিরণশংকর দাসসহ অনেক মহান ব্যক্তি এই উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে এসেছেন। বগুড়ার নবাব সৈয়দ আবদুস সোবহান চৌধুরী এ লাইব্রেরির জন্য একটি ভবন তৈরি করে দেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা লাইব্রেরির বিরাট ক্ষতি সাধন করে। তারা যুদ্ধকালে ক্যাম্পের খাবার রান্নায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরির প্রায় ১৮ হাজার বই। এই সময়ে আরো অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান বই ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ক্ষতির পরেও এই লাইব্রেরিতে টিকে যায় ১৮৫৫ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত লেখক চার্লস কিংলির দুষ্প্রাপ্য বই ‘দ্য হেরোস অব গ্রিক ফেয়ারি টেইলস’। অক্ষত রয়ে গেছে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত শ্রী প্রভাস চন্দ্র সেনের লেখা ‘বগুড়ার ইতিহাস’। এ বই বগুড়ার ইতিহাস জানার জন্য সবচেয়ে প্রামাণ্যগ্রন্থ বলে বিবেচিত হয় এখনো। এর বাইরে এখনো এই লাইব্রেরিতে এমন অনেক দুর্লভ বই রয়েছে, যা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। বগুড়ার উডবার্ন গণগ্রন্থাগারে এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। এসব বইয়ের বেশির ভাগ সংরক্ষিত আছে।
