কৃষ্ণ ভগবতগীতায় কপিলের নাম উল্লেখ রয়েছে, ‘বৃক্ষের মধ্যে আমি বট, ঋষিগণের মধ্যে আমি দেবর্ষি নারদ, গন্ধর্বগণের মধ্যে আমি চিত্ররথ ও সিদ্ধগণের মধ্যে আমি কপিল। (১০। ২৬)’। কপিল ছিলেন একজন বৈদিক ঋষি। তাকে (সাংখ্য দর্শন) তত্ত্বের অন্যতম প্রবর্তক মনে করা হয়। (সাংখ্য হলো ধ্রুপদি ভারতীয় হিন্দু দর্শনের ছয়টি আস্তিক (ও নাস্তিক) শাখার একটি। হিন্দু পৌরাণিক ঋষি কপিলকে এই দর্শন শাখার সমন্বয়ক বা প্রবর্তক মনে করা হয়। সাংখ্য দর্শন ভারতের প্রাচীনতম দর্শন শাখাগুলোর একটি।) মহাভারতের সেই মুনি কপিলের নামে কপিলমুনির নামকরণ করা হয়েছিল কি না, জানা নেই।
তবে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, গৌড়ের পরাক্রমশালী রাজা বসুদেবের পুত্র কপিলদেব পার্থিব সম্পদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে সুন্দরবনাঞ্চলীয় কপোতাক্ষের তীরে এসে একটি বটতলায় আশ্রম তৈরি করে তপস্যা শুরু করেন। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে তিনি এখানে নির্মাণ করেন একটি কালীমন্দির। তিনি তপস্যার জন্য যে স্থানে আশ্রম তৈরি করেন, সেই স্থান তারই নামানুসারে হয়েছে কপিলমুনি। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শতভিষা নক্ষত্রযুক্ত মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে এই সঙ্গমে। এই সমাগমকে ঘিরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় বিরাট মেলা, যার নাম বারুণীর মেলা। মুনি কপিল গভীর ধ্যানের দ্বারা গঙ্গাকে কপোতাক্ষের সঙ্গমে একত্রিত করেন। তাই তো এ তিথিতে কপোতাক্ষে স্নান গঙ্গাস্নানের সমতুল্য বলে সনাতন ধর্মীয় লোকজন মনে করেন। কপিলমুনি পাইকগাছা উপজেলার একটি প্রাচীন জনপদ।
কপোতাক্ষ নদের তীরে শাহ্ সুফি হজরত জাফর আউলিয়া (রহ.) ও রায় সাহেব বিনোদবিহারী সাধুর স্মৃতিবিজড়িত কপিলমুনির রয়েছে অনেক ইতিহাস। শাহ্ সুফি হজরত জাফর আউলিয়া (রহ.) ছিলেন হজরত খানজাহান (রহ.)-এর সফরসঙ্গী। তিনি সুন্দরবনের এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। কপিলমুনির রূপকার ও স্থপতি ছিলেন রায়সাহেব বিনোদবিহারী সাধু। কপিলমুনি জুড়ে তার স্মৃতি বিদ্যমান। ক্ষণজন্মা বিনোদবিহারী সাধু ছিলেন একজন তেল ব্যবসায়ী। ব্যাবসায়িক জীবনের উত্থান-পতনের সময় তাকে উপদেষ্টা হিসেবে সাহায্য করেন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। সমাজসেবামূলক কাজের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘রায়সাহেব’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৭১ সালের মে মাসের দিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও খাসসেনাদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে খুলনা শহরের খানজাহান আলী রোডের আনসার ক্যাম্পে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এর দায়িত্বে থাকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ। পরবর্তী সময়ে অনুরূপভাবে দেশের অন্যান্য স্থানেও এ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। কপিলমুনিতে ১৫০ জনের বেশি রাজাকার নিয়ে তারা বাবু বিনোদবিহারী সাধুর বাড়িতে একটি ক্যাম্প গঠন করে। এই ক্যাম্পের রাজাকাররা খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা করেনি। তারা ক্যাম্প থেকে প্রতিদিন বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্বেষণে গ্রামের নিরীহ মানুষকে ধরে এনে অত্যাচার করত। এলাকার উঠতি বয়সের যুবতি মেয়েদের ধরে এনে ক্যাম্পে অত্যাচার করা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে পড়েছিল। রাজাকাররা হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। রাজাকার বাহিনীর আগমনের সংবাদ শুনলে এলাকার নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবা সবাই পালিয়ে যেত। কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন আফসার শিকারি নামক জনৈক ব্যক্তি।
একদিনের ঘটনার কথা না বললেই নয়। ২৭ জুলাই তারিখ দিবাগত রাত ১২টার দিকে কপিলমুনির রাজাকাররা গদাইপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শেখ মাহতাব উদ্দিন মনি চেয়ারম্যান, ঘোষালের সামসু গাজী, জেলেপাড়ার বিনোদ মালো, মঠবাটির মনোহর, পুরাইকাঠীর মনু ঘোষ, মেলেকপুরাইকাঠীর অনন্ত ঘোষ ও ওভারসিয়ারের ছেলে মিজানকে ধরে নিয়ে যায়। ২৮ জুলাই সকাল ৬টার দিকে তাদের কপিলমুনি যাওয়ার পথে আগরঘাটায় কপোতাক্ষ নদের পাশে হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। গুলি করার মুহূর্তে বিনোদ মালো ও মনু ঘোষ নদীতে লাফ দিয়ে সাঁতরিয়ে পালিয়ে যায়। বাকিদের গুলি করে মেরে নদীতে ফেলে দেয়। এদের মধ্যে সামসু গাজী ও মিজানের লাশ দুই দিন পরে নদী দিয়ে ভেসে বোয়ালিয়ার জেলেদের জালে আটকে যায়। পচা-গলা সেই লাশ আমরাও দেখতে যাই। সেই স্মৃতি আমার ছোট মনে এখনো দাগ কেটে আছে।
রাজাকারদের অত্যাচারের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, এলাকার মুক্তিযোদ্ধাগণ এই ক্যাম্প ধ্বংস করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল। ৯ নম্বর সাবসেক্টর কমান্ডার লে. কমান্ডার রহমতউল্লাহ্ দাদু ভাই, স. ম. বাবর আলী, শেখ কামরুজ্জামান টুকু, শেখ শাহাদাত্ হোসেন বাচ্চু, ইউনুচ আলী, আবুল কালাম আজাদ কপিলমুনির যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেন। পাইকগাছা থানার কাটিপাড়া ক্যাম্পে লে. কমান্ডার রহমতউল্লাহ্ দাদু ভাই উপস্থিত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্রিফিং প্রদান করেন।
অন্যদিকে তালা থানার মান্দ্রা ক্যাম্পে ইউনুচ আলী ব্রিফিং প্রদান করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে জলে ও স্থলে পাহারায় বসানো হয়, যাতে রাজাকারদের সহায়তার জন্য কোনো পাকিস্তানি সেনা না আসতে পারে। ঐ দিন দিবাগত রাতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। রাত ১২টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা যার যার অবস্থানে পজিশন গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা হরিঢালী স্কুল, কপিলমুনি গার্লস স্কুল, কপিলমুনি বিদ্যামন্দির, নদীর ওপার কানাইদিয়া, গোলাবাড়ী স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ক্যাম্প ঘিরে অবস্থান গ্রহণ করেন। রাত ৪টার দিকে দাদু ভাই এসএমজি দিয়ে ফায়ার ওপেন করেন। রাজাকার ক্যাম্প লক্ষ্য করে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি শুরু করেন। রাজাকাররাও বাংকার থেকে গুলি করতে থাকে। ৬ ডিসেম্বর তারিখ ভোর হয়। এই দিন ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পান। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির সংকট দেখা দিলে কমান্ডারগণ ভারত থেকে গুলি এনে সেই চাহিদা পূরণ করেন। রাজাকাররা ক্যাম্পে আটক থেকে মাঝেমধ্যে গুলি করতে থাকে। একইভাবে ৭ থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা ক্যাম্পের মধ্যে অবস্থান করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আত্মসমর্পণ করতে বারবার মাইকযোগে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তারা আত্মসমর্পণ করে না। ক্যাম্পের মধ্য থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে থেমে থেমে গুলি করতে থাকে। বাজারের প্রধান সড়ক পার হতে গিয়ে রাজাকারদের গুলিতে কেয়ারগাতির আনসার আলী ও খুলনার আনোয়ার শহিদ হন। আগরঘাটার মুক্তিযোদ্ধা তোরাব আলী আহত হন।
রাজাকারদের বাইরের সহায়তা পাওয়ার সব আশা শেষ হয়ে গেলে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে গেলে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত হয়। ৯ ডিসেম্বর সকাল ৭টায় তারা আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা একে একে সব রাজাকারকে ক্যাম্প থেকে বের করে আনে। ক্যাম্পের মধ্যে চার জন বীরাঙ্গনাকে পাওয়া যায়। তাদের আটকে রেখে রাজাকাররা অমানুষিক নির্যাতন করেছে। তালার মাছিয়াড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী গাজীকে দেওয়ালের সঙ্গে পেরেক দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় ক্যাম্পের মধ্যে পাওয়া যায়। রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করলে এলাকার মানুষ ‘জয়বাংলা’ বলে একত্রিত হয়। তারা রাজাকারদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করতে থাকে। স্বজনহারা লোকজন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারগণ একত্রিত হয়ে রাজাকারদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এলাকার মানুষের দাবি অনুযায়ী গণ-আদালত গঠন করে তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। ১৫১ জন রাজাকারের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে, তাদের আলাদা করে এবং অন্যদের ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
রাজকারদের কপিলমুনি ক্যাম্প পতনের তাত্পর্য অনেক। এই ক্যাম্প পতনের ফলে সম্পূর্ণ পাইকগাছা এলাকা ৯ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়। যে কদিন মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকার ক্যাম্প অবরোধ করে রেখেছিলেন, সেই কদিন এলাকার জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চিড়া, মুড়ি, ডাব, রান্না খাবার সরবরাহ করে। এলাকার মানুষের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। সব মানুষ দেশপ্রেমে জাগ্রত হয়ে মুক্তির স্বাদ অন্বেষণে ঘর থেকে বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাজাকারদের দ্বারা অত্যাচারিত-স্বজনহারা এলাকাবাসী রাজাকারদের প্রতি প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠে। এরই ফলে কমান্ডারগণ গণ-আদালতে বিচার করতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। এমনি করে যদি বাংলাদেশের সব রাজাকারের বিচার করা যেত, তবে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি কখনো ক্ষমতায় আসতে পারত না। এ লজ্জা আমাদের সবার।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কপিলমুনির যুদ্ধে শহিদ কেয়ারগাতির আনসার আলী ও খুলনার আনোয়ারের নাম চিরস্বরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার বিপক্ষে থেকে জনসাধারণের প্রতি অত্যাচার করেও নিজামী-মুজাহিদরা স্বাধীন বাংলাদেশে গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয়, রাজাকার ক্যাম্পে ক্রুশবিদ্ধ শহিদ মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আলী গাজী এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। কী বিচিত্র এই দেশ!
লেখক: সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
তথ্যসূত্র :মুক্তিযুদ্ধে পাইকগাছা (প্রকাশকাল: মার্চ-২০২০)
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
