স্বপ্নের শুরু যে ঘরে...

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:২২

চুলার গনগনে আগুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টগবগ করে ফুটছে চাল। তখনো পুরোপুরি ভাত হয়ে না এলেও ভাতের গাঢ় ফ্যানের এক সুন্দর গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই গন্ধের সঙ্গে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর বড়গোলা গ্রামের পাটনিপাড়ার বাসিন্দা মালা রানির স্বপ্নের কোথায় যেন একটা অবিচ্ছেদ্য টান কাজ করছে। যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার দেওয়া তার মাথার ওপর এক টুকরো ছাদের নিশ্চয়তা। যে নিশ্চয়তা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

ধোঁয়া উঠা ভাতের পাতিলের দিকে তাকিয়ে হাসিমাখা মুখে মালা রানি বললেন, খুবই উপকার হইছে, ঘরটা পাইয়া। আগে ছনের চাল লাগানো ঘরে বৃষ্টি হলেই পানি পড়ত। এখন তো পড়ব না। ঝড়বৃষ্টির দিনেও ঘর ভেতর বসে কাজ করতে পারব।’ কি কাজ করেন? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘বাঁশ দিয়ে কুলা, খাঁচা, ডালা, চালনিসহ নানা গৃহস্থালি জিনিস তৈরি করি। তারপর সেগুলো সপ্তাহে এক দিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে কিংবা হাটবাজারে বিক্রি করি। খরচা বাদ দিয়ে যে আয় হয় তা দিয়েই টেনেটুনে চলে আমাদের চার জনের সংসার। তবে মাথা গোঁজার একটা পাকা ঘর হওয়ায় এখন আর কোনো চিন্তা নাই।

সম্প্রতি সরেজমিনে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পাটনিপাড়ায় গেলে মালা রানি এভাবেই তার স্বপ্নের কথা জানান। শুধু মালা রানিই নয়, পাটনিপাড়ার দুলাল চন্দ্র, গীতা রানি, শাপলা রানি, সুধা রাম, পল্লবী, অতুল দাশ যারা কেউই এক দিন সেমিপাকা ঘরে থাকবেন তা যেন কল্পনাও করেননি। মাটির ঘরে বসবাস করা নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী এই মানুষদের কাছে সেমিপাকা ঘর ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের এই ঘর পেয়ে এসব দরিদ্র মানুষদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল বাঁধভাঙ্গা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্বাহী সেলের তত্ত্বাবধানে সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গৃহীত কার্যক্রমের আওতায় এই সেমিপাকা ঘর তাদের দেওয়া হচ্ছে। এখানে পাটনি সম্প্র্রদায়ের ৩২ পরিবারের মধ্যে ২৫টি পরিবার এই ঘর পেয়েছে। ছয়টি পরিবারের আগে থেকেই সেমিপাকা ঘর ছিল। আর একটি পরিবারকে আগেই সরকারের বিশেষ সহায়তায় দুর্যোগ সহনীয় ঘর দেওয়া হয়েছিল।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঘরের পাশাপাশি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য পাঁচটি শৌচাগারও নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এলাকায় বিদ্যুত্ সুবিধা, এখানকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিতে উপবৃত্তিসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রংপুরের পর সরেজমিনে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কামদিয়া ইউনিয়নের চাঙ্গুরা গ্রামে গিয়েও দেখা যায়, একই অবস্থা। এখানে ‘মরাবস্তা’ নামের একটি বিশাল পুকুরের চারপাশ ঘিরে তৈরি করা হয়েছে এখানকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জন্য বাসস্থান। লাল রঙের দোচালা টিনের ছাউনির সেমিপাকা ঘরের পর ঘরের সারি সত্যি দেখার মতো। এখানে ৫০টি সাঁওতাল পরিবারের বসবাসের জন্য ঘর তৈরি করা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তাদের ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই রুমের এই বাড়ির ভেতরেই রয়েছে বাথরুম ও রান্নাঘর।

৩৫ বছরের লুচিয়া মারডি জানান, এখানে আমাদের ঘরের আশপাশে আগে জঙ্গলের মতো ছিল। কিন্তু এখন তো সরকার সব পরিষ্কার করে আমাদের জন্য সুন্দর সেমিপাকা ঘর তৈরি করে দিয়েছে। এখানে আমরা একটি স্কুল চাই। যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে।

কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চলে নীলি মুর্মুর। স্বামী দেনা মার্দী ও চার সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামর্থ্য ছিল না এমন পাকা বাড়ি তৈরির। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই বাড়ি তৈরি করে দিয়েছেন। এতে আমাদের মনোবল অনেক বেড়ে গেছে।’ তিনি এখন সন্তানদের ভালো করে মানুষ করার স্বপ্ন দেখছেন বলে জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সমতলের ৬১ জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের জন্য মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে নতুন ঘর করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই অংশ হিসেবে সাড়ে ৩ হাজার ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মণ ইত্তেফাককে বলেন, কামদিয়া ইউনিয়নের চাঙ্গুরা গ্রামের এই পুকুরপারে ৫০টি ঘর তৈরি করা হয়েছে। ঘরের রং করা বাকি থাকলেও ইতিমধ্যে সবাইকে ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া এই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সাঁওতাল সম্প্র্রদায়ের আরো ২০ পরিবারকে ঘর করে দেওয়া হয়েছে।

রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান ইত্তেফাককে বলেন, মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সারা দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের ঘর দেওয়া হচ্ছে। রংপুরেও এই কাজ অব্যাহত আছে।