কৃষিপণ্যের মূল্য ও আমদানি-রপ্তানি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৫:৫৮

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যঘাটতি তো এখন নেই-ই, উপরন্তু কখনো কখনো উত্পাদিত কৃষিপণ্য গুদামজাত করতে না পারার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদিত কৃষিপণ্য একদিকে যেমন দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা মিটিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অপরদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটায়।

আমরা অর্থনীতির ভাষায় সহজেই যে জিনিসটি বুঝতে পারি তা হলো, কোনো পণ্যের যোগান কম থাকলে চাহিদা বৃদ্ধি পায় তখন মূল্যও বেশি হয়। অপরদিকে যোগান বেশি থাকলে চাহিদা কমে এবং মূল্যও কমে যায়। বাংলাদেশের কৃষি বাণিজ্যে প্রায়শই এ বিষয়টি মাঝেমধ্যেই প্রকট আকারে ঘটতে দেখা দেয় এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এর মূল শিকার হয়ে থাকেন সবসময়েই বাংলার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক।

তবে আমদানি-রপ্তানি, গুদামজাতকরণ, সরকারি ক্রয়, সংরক্ষণ ইত্যাদি সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষিবাণিজ্য কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত করে কৃষককুলকে সহায়তা করা সম্ভব। আমরা জানি, কৃষক হলো উত্পাদক এবং তার মূলধন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশের কৃষকই যেহেতু কৃষি উন্নয়নের মূল হাতিয়ার সেজন্য কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে, বাঁচাবে দেশের কৃষি। সেজন্য কৃষক যাতে তার উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য নিশ্চিত করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পলিসি গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। প্রতি বছরের প্রতি মৌসুমেই এমনটি ঘটতে দেখা যায়। কাজেই এ সম্পর্কে কৃষকবান্ধব কোনো কিছু করাটা সময়ের দাবি।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, চাহিদা ও যোগানের সঙ্গে মূল্যের একটি সরাসারি সম্পর্ক রয়েছে; কিন্তু অনেক সময় শুধু উত্পাদন বৃদ্ধি করেই চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। সেজন্য প্রয়োজন হয় আমদানি করা। যেমন বাংলাদেশে পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ অন্যান্য মসলা জাতীয় কৃষিপণ্য। এগুলো দেশে উত্পাদনের চেয়ে প্রয়োজন বেশি হওয়ায় সেগুলো আমদানি করতে হয়। আবার যেসব কৃষিপণ্য চাহিদার বাইরে অত্যধিক পরিমাণে উত্পাদিত হয় সেগুলো রপ্তানি করতে হয়। যেমন আমাদের দেশে আলু, অন্যান্য শাকসবজি এবং বর্তমানে চালও। কাজেই উৎপাদনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে সেগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সম্প্রতি অর্থাৎ এ বছরে (২০২০-২১) কৃষিপণ্যের বাজার বেশ অস্থির ছিল। কখনো পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, কখনো আদার মূল্যবৃদ্ধি, কখনো রসুনের মূল্যবৃদ্ধি, আবার কখনো চাল কিংবা আলু। এসব মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো কোনোটার যুক্তিসংগত কারণ থাকলেও বেশির ভাগই ছিল অযৌক্তিক। কারণ চাল উৎপাদন মৌসুমে মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য ফসলেরও উত্পাদন মৌসুমে মূল্যবৃদ্ধি কোনো অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং তা যুক্তিসংগতও নয়। এক্ষেত্রে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী অথবা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেক সময় স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী হয়ে থাকে। এবারও তাই হয়েছে। কারণ দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে গুদামে গুদামে পেঁয়াজ ও আলু পচেছে অথচ অন্যদিকে বাজারে এর মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপরদিকে উৎপাদনের স্থান এবং এর সুষ্ঠু বাজার বণ্টন একই সময়ে বিভিন্নস্থানে মূল্যের পার্থক্য হতে দেখা যায়। দেখা গেছে, যে ফসল যে জায়গায় বেশি উৎপাদিত হচ্ছে সেখান থেকে যেখানে উৎপাদন নেই সেখানে মূল্যের পার্থক্য হচ্ছে। কিছুটা মূল্যের পার্থক্য যুক্তিসংগত হলেও অন্যায়ভাবে মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ক্ষতির সম্মুখীন করে তোলে। আর বরাবরের মতোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ কৃষক। সাপ্লাই চেইন সঠিকভাবে মনিটরিং না হলে উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যে এমন ফারাক হতে পারে; কিন্তু আমরা আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, মহামারি করোনাকালেও সরকারের সঠিক মনিটরিং-ব্যবস্থা চালু থাকার কারণে সাপ্লাই চেইন ঠিক ছিল এবং কৃষিপণ্যের প্রাপ্তি ও মূল্য সবার নাগালের মধ্যেই ছিল।

কখনো কখনো দেশের বাইরে মূল্য কম থাকলে আমদানি বৃদ্ধি করে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং দেশের ভেতরে উৎপাদন বেশি হলে মূল্য থাকলেও রপ্তানির মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। যেমন এবার আমন উৎপাদন মৌসুমেও চাল আমদানি করতে হয়েছে। মূল্য বেশি হলে যেমন ভোক্তাগণের সমস্যা, আবার কম হলেও কৃষকের সমস্যা। কারণ তখন উৎপাদন ব্যয় না উঠলে কৃষক চাষাবাদে উৎসাহ বোধ করবেন না। কাজেই কৃষিপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য উত্পাদন, বাজারব্যবস্থা, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদি সবকিছুর ওপরই নির্ভর করে। সেজন্য এগুলো সম্পর্কে সময়মতো সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হলেই এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন