নির্বাচিত বেসামরিক সরকার থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের ফলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ গুলো। নিষেধাজ্ঞাগুলি আরোপ করার হুমকিও দিয়েছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এবং জেনারেলদের ক্ষমতা ত্যাগের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ভারত। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ হিসেবে চীন আহ্বান জানিয়েছে সব মতভেদ দূর করার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে নিন্দা প্রস্তাবেও ভেটো দিয়েছে চীন।
মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট রবার্ট মেনেনডেজ প্রস্তাব করেছিলেন যে ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য দেশগুলিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে "কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা" প্রয়োগ করা উচিত যদি তারা দেশের নির্বাচিত নেতাদের মুক্তি না দেয় এবং নিজেকে সরকার থেকে সরান।
মার্কিন সিনেটের রিপাবলিকান নেতা মিচ ম্যাককনেল তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি "ভয়াবহ" বলে অভিহিত করে বলেন, অভ্যুত্থানের পেছনে থাকা লোকদের চাপে রাখা উচিৎ।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সমাধান সন্ধান করতে এবং পরিস্থিতিটিকে আরও তীব্রতর করা এড়াতে স্ব-সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে ভারত ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ এবং সেখানকার পরিস্থিতি ‘নিবিড়ভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছে তারা। ‘মিয়ানমারের গণতন্ত্রে উত্তরণের বিষয়ে সব সময় সমর্থন জানিয়ে আসছে ভারত। আমরা বিশ্বাস করি, আইন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে।
অন্যদিকে, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা আশাবাদী যে, দুই পক্ষ গঠনমূলক আলোচনা করবে। এক বিবৃতিতে পাকিস্তান বলে, ‘আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই নিজেদের সংবরণ করবে, আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখবে, গঠনমূলকভাবে আলোচনা করবে, এবং শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে। ’
মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে মুক্তি দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে জাপান।সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। জাপানের পররাষ্ট্র মোতেগী বিবৃতিতে বলেন, “মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারিতে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক রয়েছি। আমরা চাই, মিয়ানমারের সামরিক শাসক দ্রুত ক্ষমতাসীন নেত্রী অং সান সুচিকে মুক্তি দেবে।” জাপান মিয়ানমারের গণতন্ত্রকে সব সময় সমর্থন করে। আমাদের বিশ্বাস, মিয়ানমারের সামরিক সরকার দ্রুত দেশে রাজনীতির চর্চা ফিরিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করবে।
আংকারা সেন্টার ফর ক্রাইসিস অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের (এএনকেএএসএএম) জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ সিফেত্তিন ইরোল বলেন, মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে মূল কারণ এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন-মার্কিন প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।
সেনাবাহিনী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় মিয়ানমার ও এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও আরও কয়েকটি পশ্চিমা দেশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রদর্শন হচ্ছে এই অভ্যুত্থান। ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারকে হটিয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের মানবাধিকার কিংবা গণতান্ত্রিক অবস্থা নিয়ে হতাশার চেয়েও কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হারানোর বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে।’
মিয়ানমারের সামরিক সরকার ও চীনকে দমিয়ে রাখতে রোহিঙ্গা মুসলমানসহ দেশটির নৃতাত্ত্বিক এবং সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করা নিয়েও হুশিয়ারি দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, এতে এসব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমনমূলক নীতি বাড়বে।এশীয়বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হায়াতি উনলু বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চীনের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হচ্ছে মিয়ানমার।
মায়ানমারের সংবিধান অনুসারে জাতীয় সংসদে সেনার জন্য সংরক্ষিত ২৫ শতাংশ আসন। এর ফলে কোনও দল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়লেও সেনার ক্ষমতা থেকেই যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবর, সেনার ক্ষমতা কমাতে এই আইনটি সংশোধনের পথ নিতে চলেছিলেন সু কি। এই কারণে সেনার সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়। এর পরিণতি ফের সেনা অভ্যুত্থান।বিবিসি জানাচ্ছে অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী একটি সুপ্রিম কাউন্সিল গঠন করেন, যারা মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। দ্যা ইরাওাদ্দি।
ইত্তেফাক/এএইচপি
