বিষাক্ত বাতাসে বসবাস

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:০৫

বাতাস ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। তবে এ বাতাসকে হতে হবে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন। নির্মল বায়ু ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি কখনো কখনো নির্মল বায়ুর অভাব মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতির দান এ অমূল্য সম্পদকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলে খ্যাত মানুষ এখন আর নির্মল থাকতে দিচ্ছে না। ইট পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকাজ থেকে নির্গত ধুলাবালির মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বায়ুকে দূষিত করে তুলছে। মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের ফলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকলে ফুসফুসের সংক্রমণ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হূদরোগ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ) প্রভৃতি রোগসমূহের আশঙ্কা বাড়ে। বায়ুদূষণের ফলে ফুসফুসজনিত ব্রংকাইটিস, হাঁপানিসহ বড় বড় অসুখ যেমন হয়, তেমনি জ্বর-ঠান্ডা, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়ার মতো ছোট ছোট স্বাস্থ্যগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এছাড়া, ধীরে ধীরে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস ও ফুসফুসকে দুর্বল করে ফেলে। যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। আবার যেসব এলাকায় বায়ুতে অতিরিক্ত সীসাদূষণ হয়, সেসব এলাকায় সদ্যোজাত শিশুদের দেহে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের রক্তে সীসার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে এসব এলাকার শিশুদের বুদ্ধিসত্তা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

 বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বে বায়ুদূষণের শহরগুলোর শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকা। অতিসাম্প্রতিককালে ঢাকার বাতাস স্মরণকালের সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুমান যাচাইবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (০১ ফেব্রুয়ারি)  এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই)  ঢাকার স্কোর ছিল ১৮৮, যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়।  অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে  ভারতের ‘গ্যাস চেম্বার’ আখ্যা পাওয়া দিল্লির বাতাসের চেয়েও বেশি দূষিত হয়ে পড়েছে ঢাকার বাতাস, একিউআই অনুসারে দিল্লির স্কোর ছিল ১৮৬। মূলত শহরের বাতাস কতটুক নির্মল বা দূষিত, বাতাস কতটুকু দূষিত হলে স্বাস্থ্যের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে, সে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এয়ার ভিজ্যুয়াল আলোকপাত করে থাকে। বায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি এখনি বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।

 বায়ুদূষণের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক অনেক পুরোনো। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে শহরের বাতাসের মান কিছুটা উন্নত থাকে। শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে শীতকালে দূষণের মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। সাধারণত শীতকালে যেহেতু বৃষ্টি কম হয়, ফলে এ সময়ে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ইটের ভাটায় ইট তৈরির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এতে প্রচুর ধুলাবালি ও ধোঁয়া সৃষ্টি হয়, যা বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখে। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ক্ষতিকর অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ এমনিতেই বেশি থাকে। বায়ুদূষণের আরো উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো— শিল্পায়ন, নগরায়ন, শিল্পকারখানার বর্জ্য,  ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি। বাতাসে বিদ্যমান উন্মুক্তভাবে নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধূলিকণা, সালফার-ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, লেড বা সীসা, অ্যামেনিয়া, সাসপেনড পার্টিকুলার ম্যাটার বহুলাংশে বায়ু দূষণের জন্য দায়ী। তাছাড়া, শহরের ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলে রাখায় তা পচে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা বায়ুকে দূষিত করছে।

বর্তমান সময়ে আমরা বায়ুদূষণ নামক এক আতঙ্কের মধ্যে বাস করছি। এই দূষণের মাত্রা মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখনি আমাদের ভবিষ্যত্ কল্যাণের কথা চিন্তা করে ঢাকার এ বায়ুদূষণকে অবশ্যই সহনীয় মাত্রায় আনতে হবে। বায়ুদূষণ রোধে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া থেকে বাঁচতে এসব যানবাহনের কঠোর আইনি পদ নিতে হবে। ইটের ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। শহরাঞ্চলে বসবাসরত নাগরিকদের বায়ুদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। নাগরিক উদ্যোগ গৃহীত হলে সমস্যার সমাধান সহজ হয়। সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে পরিবেশ রক্ষায় নতুন আইন প্রণয়ন করা এবং বিদ্যমান আইনের যথোপযুক্ত সংশোধন করা উচিত। সবুজায়নে অথিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। তাছাড়া, রাস্তাঘাটে উন্মুক্ত অবকাঠামো নির্মাণকাজ বন্ধ করা ও এসব সামগ্রী নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় রেখে কাজ হচ্ছে কি না, যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ধুলাবালি থেকে বেঁচে থাকতে মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা। সর্বোপরি, সবার ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের দ্বারা দেশ একদিন এ ভয়াবহ দূষণ থেকে পরিত্রাণ পাবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়