মদের মাদকতা এমনই যে, ইহাতে আসক্ত হইয়া পড়িলে অনেকেই একধরনের চক্রবৃত্তে আটকাইয়া যাইতে পারেন। কথিত আছে, বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন বলিয়াছিলেন, ‘সিগারেট ছাড়িয়া দেওয়া কোনো ব্যাপারই নহে। আমি অনেকবার ছাড়িয়াছি।’ ইহার অর্থ হইল, তিনি অনেকবার সিগারেট ধরিয়াছিলেন, না হইলে ছাড়িবার প্রশ্ন আসে না। অর্থাত্, নেশা ত্যাগ করা অত্যন্ত কঠিন। মদের ক্ষেত্রেও ইহা ষোলো আনা প্রযোজ্য। নেশা ভালো কথা নহে বটে, তবে প্রাপ্তবয়স্ক কেহ যখন নিয়মের মধ্যে মদ্যপান করেন, তখন কিছু বলিবার থাকে না। সম্প্রতি বাংলাদেশে ভেজাল মদ খাইয়া গত কয়েক দিনে রাজধানীতেই মারা গিয়াছেন একটি বেসরকারি ফার্মের তিন কর্মকর্তা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। ইহা ছাড়া সম্প্রতি বগুড়া ও রাজশাহীতে এবং ২০১০ সালে সিলেটের বালাগঞ্জে বিষাক্ত মদপানে মারা গিয়াছেন ২০ জনের অধিক।
বিষাক্ত মদ্যপানে মৃত্যুর ঘটনা এই উপমহাদেশে প্রায়শই ঘটিয়া থাকে। এই যেমন গত বত্সরে আগস্ট মাসে ভারতের পাঞ্জাবে বিষাক্ত মদ্যপানে ৮৬ জন মারা গিয়াছিলেন। দেশটির পশ্চিমবঙ্গ, বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যে অতীতে বিষাক্ত মদ্যপানে প্রায়শই মানুষ মারা যাইত। সম্প্রতি তাহা অবশ্য কিছুটা কমিয়া আসিয়াছে সেইখানকার প্রশাসনের বিভিন্ন তত্পরতায়। অর্থাত্, প্রশাসন যদি বিষাক্ত মদ তৈরির সহিত সংশ্লিষ্টদের কান ধরিয়া টান দেন, তাহা হইলে ইহার মাথা চলিয়া আসিতে বাধ্য। সম্প্রতি করোনাকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সধারী মদের বারগুলিতে বিদেশি মদ বিক্রয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হইয়াছিল। আর ইহাতে হঠাত্ করিয়াই বাজার হইতে বিদেশি মদ উধাও হইয়া যায়। এই কৃত্রিম সংকটেরই সুযোগ লইয়াছে কিছু অসাধু চক্র। তাহারা বিদেশি বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের বোতলে মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল, স্পিরিটের পাশাপাশি নেশাজাতীয় অন্যান্য পদার্থমিশ্রিত নকল মদে বাজার সয়লাব করিয়া ফেলিয়াছে। এই ভেজাল মদ প্রস্তুতকারীরা ভালোমন্দের কথা বিবেচনা না করিয়া শুধু বাড়তি লাভের আশায় এই ধরনের বিষাক্ত মদ বাজারে ছাড়িতেছে। ইতিমধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি নকল মদের কারখানার সন্ধান মিলিয়াছে। জানা গিয়াছে, এই সকল কারখানায় পানি, রেকটিফাইড স্পিরিট, ইথানল, মিথানলসহ উচ্চ তাপমাত্রার অ্যালকোহল, রং ও ঘুমের ঔষধ মিশাইয়া বিষাক্ত মদ তৈরি করা হইয়া থাকে। ইহা ছাড়া দেশীয় চোলাই মদের সহিত অতিমাত্রায় অ্যালকোহল মিশাইয়াও তৈরি হইয়া থাকে অতি তীব্র মাদক। ইহা পান করিয়া অনেকেই সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কোলেও ঢলিয়া পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সত্যিকারের ওয়াইন বা মদ হইল ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল। ইহা সকল সময়ই খাওয়ার যোগ্য উত্স হইতে উত্পাদন করা হয়, যাহা নিরাপদ। কিন্তু মিথানল বিপজ্জনক। ইহা দিয়াই ভেজাল মদ তৈরি করা হয়। এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা জানাইয়াছেন, সস্তা ও ভেজাল মদে ইথানলের পরিবর্তে মিথানল মিশাইবার কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কিডনি ও হার্ট অকার্যকর হইয়া মারা যাইতেছে অনেকে।
মিথানল দামে সস্তা হওয়ায় বিষাক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই উপকরণ অসাধু উত্পাদকারীরা ব্যবহার করিতে দ্বিধা করেন না। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বিদেশি মদ আমদানিতে অনেক বিধিনিষেধ রহিয়াছে, অনেক টাকা কর দিতে হয়। ফলে দেশে মদের যেই পরিমাণ চাহিদা রহিয়াছে, তাহার খুব সামান্যই আমদানি হইয়া থাকে। আর ইহারই সুযোগ লইতেছে অসাধু চক্রগুলি। জানা গিয়াছে, গত ১০ বত্সরে মদ বিক্রির লাইসেন্স ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাইলেও সেই অনুযায়ী তদারকি বৃদ্ধি পায় নাই। ‘বিষাক্ত মদ’ তৈরি আর ‘বিষ’ তৈরির মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। আমরা দেখিতে পাইতেছি, একদিকে মদ বিক্রয়ও করা হয় আবার দুষ্প্রাপ্যও করা হয়। ইহা যেন ধরি মাছ না ছুঁই পানি।
