আব্রাহামের দাসপ্রথা বিলুপ্তি ও ক্যাপিটল হিল

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫৯

আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিপর্যয়, যা যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। ১৮৬১ সালে এর চেয়েও ভয়াবহ রাজনৈতিক, মানবিক, অর্থনৈতিক এবং সাংবিধানিক সংকটে নিপতিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নভেম্বর ১৮৬০ সাধারণ নির্বাচনে, পপুলার এবং ইলেকট্ররাল কলেজের ভোটে, আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। লিংকন ফেব্রুয়ারি ১২, ১৮০৯ হোজেনভিল, কেন্টাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম থমাস লিংকন। আব্রাহাম লিংকন শৈশব থেকে ১৮৩৫ পর্যন্ত দরিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করেই বড় হয়ে ওঠেন। তিনি স্বশিক্ষিত ছিলেন এবং ১৮৩৬ স্প্রিংফিল্ড বারে আইন পেশায় যোগদান করেন। লিংকন ইলিনয় থেকে ১৮৩৪-১৮৪২ পর্যন্ত মোট পাঁচবার স্টেট আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। হুইগ পার্টির প্রার্থী হিসেবে ১৮৪৬ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ নির্বাচিত হন।

দাসপ্রথার বৈধতার বিষয়ে, স্ব স্ব স্টেটকে ক্ষমতা অর্পণ করে, ‘কানসাস নেব্রাসকা অ্যাক্ট অব ১৮৫৪' ইউএস কংগ্রেসে পাশ করা হয়। উক্ত আইনের বিরুদ্ধে ৩৪টি স্টেটে প্রচণ্ড বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। লিংকন ১৮৫৪ সালে হুইগ পার্টি থেকে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগদান করেন। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উন্নতি লাভ করতে থাকে। উত্তরাঞ্চলের স্টেটগুলোতে শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া লাগে। কৃষিখাতও আংশিক যন্ত্র নির্ভরশীল ছিল। সড়ক, জনপথ ও রেলপথ উন্নয়নের কাজ দ্রুত এগোতে থাকে। পক্ষান্তরে, দক্ষিণাঞ্চলের স্টেটগুলো দাসনির্ভর কৃষি, তুলা, তামাক উত্পাদন এবং তাঁতশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের প্রধান আয় ছিল দাস ব্যবসা। ১৮৬১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পেছনে উপরিউক্ত কারণগুলো অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বলে বিবেচিত হয়।

আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। লিংকন মার্চ ৪, ১৮৬১ প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন (মার্চ ৪, ১৮৬১—এপ্রিল ১৫, ১৮৬৫)। তিনি অত্যন্ত দক্ষ, মানবিক এবং দায়িত্বশীল ছিলেন। লিংকন কৃষক, শ্রমিক এবং কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং দাসপ্রথার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেন। ফেব্রুয়ারি ১২, ১৮৬১ দক্ষিণ অঞ্চলের সাতটি স্টেট সাউথ ক্যারোলিনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, অ্যালাবামা, মিসিসিপি, লুইসিয়ানা, টেক্সাস মূল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ইউনিয়ন) থেকে বেরিয়ে কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা গঠন করে। এপ্রিল ১২, ১৮৬১ কনফেডারেটের আর্টিলারি বাহিনী, ইউনিয়ন বাহিনীর অধীনস্থ ফোর্ট সামটার লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করে। এখান থেকেই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। অতঃপর ইউনিয়ন বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৫ এপ্রিল, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কনফেডারেট স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সাউথ ক্যারোলিনায় ফেডারেল বাহিনীর (ইউনিয়ন বাহিনী) ৫ লাখ সৈন্য প্রেরণ করেন। অতঃপর দক্ষিণের দাসনির্ভর আরো চারটি স্টেট—ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলিনা, আরকানসাস এবং টেনাসি ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায়। মোট ১১টি স্টেট মূল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে জেফারসন ডেভিসের নেতৃত্বে ‘কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা’ গঠন করে এবং জেফারসন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধ ছিল তাদের বিরুদ্ধে— যারা মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে, গণতন্ত্রকে হত্যা ও সংবিধানকে পদদলিত করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে এবং কনফেডারেট স্টেট অব আমেরিকা গঠন করে। লিংকনের যুদ্ধ ছিল মানবিকতা, সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকে সমুন্নত রেখে অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করা।

লিংকন অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন জানুয়ারি ১, ১৮৬৩ আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ক্রীতদাসদের মুক্তি ঘোষণায় স্বাক্ষর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনত ক্রীতদাসপ্রথার অবসান ঘটল। ঘোষণায় তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আদেশ দিচ্ছি এবং ঘোষণা করছি যে উল্লিখিত স্টেটগুলোতে ক্রীতদাসরূপে যারা বন্দি রয়েছে তারা এখন থেকে স্বাধীন, মুক্ত। দাসপ্রথা এই মুহূর্ত থেকে বিলুপ্ত হলো। তিনি ক্রীতদাসদের অন্ধকার জগত থেকে আলোর জগতে ফিরিয়ে আনেন। দক্ষিণ অঞ্চলের ১১টি স্টেট দাসপ্রথার বিলুপ্তি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধের লেলিহান শিখা ভয়ংকর রূপ লাভ করে; কিন্তু লিংকন তার সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল ছিলেন।

নভেম্বর ১৯, ১৮৬৩, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গ যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে হূদয়স্পর্শী ভাষণে বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা, আমাদের জন্য একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। যেখানে প্রতিটা মানুষ সম-অধিকার, এক ও অভিন্ন স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবেন। সাহসী যোদ্ধারা যুদ্ধে নিজেদের জীবন উত্সর্গ করেছেন এবং জাতির জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন। তাদের প্রতি আমরা সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে দলমত, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে, তাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার মাধ্যমে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে পারি। তবে তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আবেগাপ্লুত হয়ে লিংকন বলেন, ‘গভমেন্ট অব দি পিপল, বাই দি পিপল অ্যান্ড ফর দি পিপল।’ দুই মিনিটের ভাষণে বদলে গেল গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলো। জনগণ আবেগে আপ্লুত হলো।

এপ্রিল ৯, ১৯৬৫ জেফারসনের নেতৃত্বাধীন কনভেটারেট বাহিনীকে পরাজিত করে, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বাধীন ‘ইউনিয়ন’ বাহিনী জয় লাভ করে। এপ্রিল ৯, কনভেটারেটর বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ই লি ‘ইউনিয়ন’ বাহিনীর কমান্ডার ইউলিশিস এস গ্রান্টের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মার্কিন গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। গৃহযুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ সৈন্য নিহত হয়। প্রায় ৩ লাখের ওপরে সৈন্য আহত হয়। তার পরের ইতিহাস আরো নিষ্ঠুর, বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক।

ওয়াশিংটন ডিসি ফোর্ডস অডিটরিয়ামে, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন রাতে থিয়েটার দেখার সময়, থিয়েটারের একজন অভিনেতা জন উইলকেস বোথ খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে, লিংকন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এপ্রিল ১৫, ১৮৬৫ সকালে পিটারসন হাউজে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নভেম্বর ২০২০ নির্বাচনের ইলেকট্ররাল কলেজ ভোটের ফলাফলকে স্বীকৃতি দিতে জানুয়ারি ৬, ২০২১ কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশন চলাকালে ট্রাম্পের হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট ও নিও নািজ গ্রুপের উগ্র সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলের বাইরে ও ভেতরে ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব চালায় এবং উগ্র ডানপন্থিরা কংগ্রেসের অধিবেশনকক্ষে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল পেন্স, অন্যান্য সিনেটর, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার ও অন্য সদস্যবৃন্দকে ক্যাপিটল পুলিশ সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। উগ্র ডানপন্থিদের দুই নেতা—ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স ও স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির চেয়ার সাময়িকভাবে দখল করে নেয়। উগ্রপন্থিদের এ দৃশ্য সিএনএন ও বিবিসি নিউজের সুবাদে বিশ্ববাসী অবলোকন করে। এ দৃশ্য আমেরিকানরা তথা বিশ্ববাসী স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের প্রতীক ক্যাপিটল হিলের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। উগ্রপন্থিদের হাতে রিপাবলিকানদের দলীয় পতাকা এবং কনফেডারেট বাহিনীর পতাকা দেখা যায়। এই দিনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ দৃশ্য দেখে দেড়শ বছর আগের আমেরিকান গৃহযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এতদসত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং গণতন্ত্রের শিকড় অনেক গভীরে। জানুয়ারি ৬, ওয়াশিংটন ডিসি তথা সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। অবশেষে আকাশের কালো মেঘ কেটে গিয়ে নতুন সূর্য উদিত হয়। বিভক্ত জাতি একত্রিত হয়ে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় হয়ে এগিয়ে যাবে—আমাদের বিশ্বাস।

আব্রাহাম লিংকনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, গণতন্ত্রের পুরোধা এবং কৃতদাসপ্রথা বিলুপ্তির মহানায়ক বিশ্ববাসীর হূদয়ে চির অম্লান ও চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যুক্তরাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে যেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র হুমকির মুখে নিপতিত, সেখানে এরকম একজন আব্রাহাম লিংকন খুবই প্রয়োজন। ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্রের বিজয় সুনিশ্চিত’—আমরা আশাবাদী।  

n লেখক :প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক,

জাতীয় চার নেতা পরিষদ।