সুরের টান কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘ও আমার আট কোটি ফুল দেখ গো মালি’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেব না’— এসব দেশাত্মবোধক গান বাংলাদেশের মানুষের হূদয়ে চিরকাল বেজে যাবে। তার গান দেশকে ভালোবাসার মন্ত্রের মতো মানুষের হূদয়ে বাজে। দেশের প্রতি, দেশের জন্য নিজেকে উত্সর্গ করবার প্রেরণা জোগায় তার গান।
এই বিখ্যাত সংগীত ব্যক্তিত্ব, বরেণ্য গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই (ইন্নালিল্লাহি..রাজিউন)। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় হার্ট আ্যাাটাক হলে তাকে আয়েশা ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের চিকিত্সকরা জানান, তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
মৃত্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। ১৯৫৬ সালের পহেলা জানুয়ারি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগীত চর্চা শুরু করেন। ১৫ বছর বয়সে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ২০১২ সালের আগস্টে বুলবুলের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পরের বছর খুন হন তার ছোট ভাই আহমেদ মিরাজ।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সংগীতাঙ্গনে। তাত্ক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে অনেকেই ছুটে যান শিল্পীর বাসায়। শিল্পী কুমার বিশ্বজিত্, এন্ড্রু কিশোর, কবির বকুল, রুমানা ইসলাম, দিনাত জাহান মুন্নী, সালমা, সাব্বীর, গীতিকার আসিফ ইকবাল, সংগীত পরিচালক ইথুন বাবুসহ আরো অনেকেই ছুটে আসেন।
কুমার বিশ্বজিত্ বলেন, আমাদের দেশাত্মবোধক গানে তিনি এক অমর আত্মা। তাকে হারানোর ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ হবে না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, আজ বুধবার বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের লক্ষ্যে প্রয়াত বুলবুলের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে এ মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীকে। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানো শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জোহর নামাজের পর তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তার মরদেহ নেওয়া হবে এফডিসি প্রাঙ্গণে।
বুলবুলের ছেলে সমীর আহমেদ জানান, বুধবার জোহরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার বাবার জানাজা হবে। আছর নামাজের পর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, সংস্কৃতি মন্ত্রী কে এম খালেদ প্রমুখ। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল দীর্ঘদিন ধরে হূদরোগে ভুগছিলেন। কয়েক মাস আগে চিকিত্সার জন্য হাসাপাতালে ভর্তি হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিত্সার সকল ব্যয়ভার সরকারের পক্ষ থেকে বহনের ঘোষণা দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এ জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন। হাপাতালে তার হূদযন্ত্রে রিং সংযোজন করা হয়েছিল।
বাংলা সংগীত জগতে আহেমদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন এক মেধাবী গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। চলচ্চিত্রেরও সংগীত পরিচালনা করেন। প্রধানত দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গানে সুর করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খ্যাতিলাভ করেন। সবসময় তিনি বলতেন, প্রকৃতি আমার শিক্ষাগুরু। জীবনের শুরুতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিটার। মাত্র সাড়ে তের বছর বয়েসে প্রথম গান লেখেন ‘ও মন ময়না, আয় ফিরে আয় না’। দেশের সংগীত জগতে অবদানের জন্য আহেমদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া সংগীতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা এবং পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বুলবুল অসংখ্য গানে সুর করেছেন, যার অধিকাংশ গানই তার নিজের রচিত। বেলাল আহমেদের পরিচালনায় ১৯৮৪ সালে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের সংগীতায়োজন করেন বুলবুল। ওই সিনেমার জন্য তার লেখা ‘আমার সারাদেহ খেয়োগো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’ গানগুলো সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এর পরের চল্লিশ বছরে মরণের পরে, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল, অন্ধ প্রেম, রাঙ্গা বউ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পরে না চোখের পলক, তোমাকে চাই, লাভ স্টোরি, ভুলো না আমায়, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, আন্দোলন, মন মানে না, জীবন ধারা, সাথি তুমি কার, হুলিয়া, অবুঝ দুটি মন, লক্ষ্মীর সংসার, মাতৃভূমি, মাটির ঠিকানাসহ দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন বুলবুল। প্রেমের তাজমহল সিনেমার জন্য তিনি ২০০১ সালে এবং হাজার বছর ধরে সিনেমার জন্য ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত আয়োজনের পাশাপাশি দেশের সমকালীন শিল্পীদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেছেন বুলবুল। তার কথা আর সুরের গান নিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আবদুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনক চাঁপা, জেমসসহ দেশের বহু জনপ্রিয় শিল্পীর অ্যালবাম বের হয়েছে।
বুলবুলের লেখা ও সুর করা আরো উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো— একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না, আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি, ও আমার মন কান্দে/ ও আমার প্রাণ কান্দে, আইলো দারুণ ফাগুনরে, আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা, আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি, তোমায় দেখলে মনে হয়/ হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়।
জেপি’র শোক
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক, সুরকার এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে জেপি’র নেতৃদ্বয় বলেন, তিনি আমাদের সংগীত অঙ্গনে নিজ মেধাবলে এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করেছিলেন।
