ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক। এ মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ৯৭ কিলোমিটার। এ অংশে বিশেষ করে রাত নেমে এলে বেপরোয়া হয়ে ওঠে প্রাইভেট গাড়িতে করে ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্র। গত প্রায় এক বছরে শতাধিক ছিনতাই, ডাকাতি, ঠেকবাজি, খুন ও ইয়াবা-মাদকদ্রব্য পাচারসহ নানা অপরাধের ঘটনায় উদ্বিগ্ন এ পথের যাত্রী, চালক ও পথচারীরা। এছাড়া কম ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভনে যাত্রী পরিবহনের ছদ্মবেশে প্রাইভেট গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে মারধর ও অজ্ঞান করে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে সড়কের পাশে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ছাড়াও মোটরসাইকেল আরোহীদের ব্যারিকেড দিয়ে বাইকসহ সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। কখনো মহাসড়কের পাশে মিলছে অজ্ঞাতনামা লাশও। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর রাতে মহাসড়কের জেলার দাউদকান্দি উপজেলার টোলপ্লাজা এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন আজিজুল নামের এক ট্রাকচালক। পুলিশ ও মহাসড়কসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলার সদর থানার বেলপাড়া গ্রামের লাইজু মিয়ার ছেলে চালক আজিজুল (৪২) চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা অভিমুখী মালবাহী একটি ট্রাক নিয়ে বৃহস্পতিবার ভোর রাতে দাউদকান্দি টোলপ্লাজা এলাকায় ট্রাকটি থামিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে মহাসড়কের পাশে প্রস াব করতে যান। এ সময় সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সঙ্গে থাকা নগদ টাকা লুটে নেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি বিকালে মহাসড়কের জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় প্রাইভেট কারের চালক ও যাত্রীবেশে ডাকাতদের কবলে পড়েন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তা মোর্শেদ আজম বাকী বিল্লাহ। ডাকাতরা তাকে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে দুইটি বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে মোট ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে রাতে মহাসড়কের পাশে ফেলে যায়। গত ২৬ জানুয়ারি রাতে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় রেজাউল করিম নামের এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ছিনতাইকারীরা প্রাইভেটকার দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে তাকে ও এক মহিলাকে শিশুসহ প্রাইভেট কারে তুলে মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ সময় ছিনতাইকারীরা রেজাউলকে মারধর করে চোখ বেঁধে সড়কের পাশে ফেলে দেয় এবং মহিলাকেও চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ছেড়ে দেয়। এ নিয়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনসহ অন্তত শতাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে মহাসড়কসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তিশা পরিবহনের চালক সুমন আহমেদ, রয়েল কোচের চালক ফিরোজ মিয়াসহ অন্তত ১২ জন গাড়ির চালক ও যাত্রীর সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, এ মহাড়াসড়কে ছিনতাই, ডাকাতি, ঠেকবাজি, খুন ও মাদকদ্রব্য পাচারসহ নানা অপরাধের ঘটনা ক্রমে বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনায় যাত্রী হতাহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থ লুটে নেওয়াসহ যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার নামে প্রাইভেট গাড়িতে তুলে হত্যাকাণ্ড, ছুরিকাঘাত, মারধর ও অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে চলাচল নিরাপদ রাখতে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের টহল জোরদার করার জন্য দাবি জানান তারা। এ বিষয়ে হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে যাত্রীদের পরিবহনের নামে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনসহ নানা অপরাধ প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহাসড়কে গাড়ির চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে নিরীহ যাত্রীদের পরিবহনের নামে ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতির মাধ্যমে সর্বস্বান্ত করার খেলায় মেতে উঠেছে একশ্রেণির ভয়ংকর পেশাদার অপরাধী চক্র। তবে যে কোনো ঘটনাই পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। মহাসড়কে অপরাধ দমনে পুলিশ প্রিভেনটিভ অ্যাকশনে কাজ করছে।’
