মাধব রায়, গল্পকার ও সহকারী অধ্যাপক পদার্থবিজ্ঞান
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
চা শেষ হলে নীলকান্তবাবু বললেন-সিলেটে রবীন্দ্রনাথ আগমনের শতবর্ষ উত্সবে রেখার গানগুলো কিন্তু চমত্কার হয়েছে। বিশেষ করে একক কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত।
কমলা বললেন-আবার গা দেখি।
রেখা গান ধরল-আকাশ ভরা, সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ।
গান শুনে একে একে সবাই এসে উপস্থিত। বিন্দু, সীমা, অণু, আকাশ, চন্দ্রা, কণিকা সবাই।
কণিকা বলল-বাবা, বিশ্বটা কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে?
আকাশ বলল-বিগব্যাং এর মাধ্যমে। তাই না মামা? বলে নীলকান্তবাবুর দিকে তাকাল।
কমলা বললেন-তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্যটা একটু আমাদের শোনাও না।
নীলকান্তবাবু বললেন-মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য অত্যন্ত নিগূঢ়। প্রথমে ভাবা হতো পৃথিবীটা হলো মহাবিশ্বের কেন্দ্র। খ্রিস্ট জন্মের ৪০০০ বত্সর পূর্ব থেকেই এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল এবং এমনকি গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল, জ্যোতির্বিদ টলেমি পর্যন্ত এই ধারণা পোষণ করতেন। খ্রিস্ট জন্মের ২৭০ বত্সর পূর্বে এরিস্টটলের ছাত্র জ্যোতির্বিদ এরিস্টার্কাস এই মতবাদের বিরোধিতা করে বলেন-পৃথিবী স্থির নয়, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো ঘুরছে। তবে এরিস্টার্কাস-এর এই কথা কেউ বিশ্বাস করেনি এবং অনেকদিন, প্রায় ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লোকজন এটাই বিশ্বাস করত যে, পৃথিবীই স্থির।
সীমা বলল- ১৫৪৩ সালে কে এই ধারণা পরিবর্তন করে দেন?
পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ এবং ধর্মযাজক নিকোলাস কোপার্নিকাস পৃথিবী স্থির তত্ত্ব পাল্টে দেন এবং বলেন, সূর্য স্থির এবং মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো ঘুরছে। জার্মান বিজ্ঞানী কেপলার বলেন সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো ডিম্বাকার পথে প্রদক্ষিণ করছে। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পর কেপলার-এর এই বক্তব্য সকলেই বিশ্বাস করেন এবং ১৬০৯ সালে টলেমি পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পাল্টাতে সকলকে বাধ্য করেন।
চন্দ্রা বলল-কিন্তু মামা, এটা তো হলো ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করার ইতিহাস। ধারণাটা পাল্টালো কীভাবে?
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ধর্মযাজক জর্জ ল্যামাইটার বলেন-মহাবিশ্ব ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে।
১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে জন খ্রিস্টিয়ান ডপলার একটি পরীক্ষার সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করেন যে, কোনও তরঙ্গের উত্স যদি পর্যবেক্ষকের দিকে আসতে থাকে, তাহলে মনে হবে এর কম্পাংক বেড়ে যাচ্ছে। আর যদি দূরে যেতে থাকে, তাহলে মনে হবে এর কম্পাংক কমে যাচ্ছে। একে বলা হয় ডপলার ক্রিয়া।
অণু বলল-হ্যাঁ, আমরা রাস্তায় দাঁড়ালে যদি কোনও গাড়ি হর্ন বাজিয়ে আমাদের দিকে আসতে থাকে, তাহলে শব্দ জোরালো হয়। আর দূরে যেতে থাকলে শব্দ কমে যেতে যেতে একেবারে মিলিয়ে যায়।
বিন্দু এই সমস্ত আলোচনায় মন বসাতে পারছিল না। সে আস্তে আস্তে উঠে গেল।
আকাশ বলল-ডপলার ক্রিয়ার সাথে বিশ্বসৃষ্টির কী সম্পর্ক?
১৮৬৮ সালে স্যার উইলিয়াম হাগিনস কয়েকটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালি পরীক্ষা করে দেখান যে, ফ্রনহফার কালো রেখাগুলি সৌরবর্ণালিতে স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সামান্য লালের দিকে সরে যায়। একে বলা হয় লাল অপসারণ। দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো থেকে আগত রশ্মিগুলো লাল অপসারণ প্রদর্শন করার মানে হচ্ছে এগুলো পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরে সরে যাবার ক্ষেত্রে এরা আবার একটি সূত্রও অনুসরণ করছে। যে নক্ষত্রগুলো যত দূরে, তার দূরে সরে যাবার বেগ তত বেশি।
তাহলে তো বেগ দূরত্বের সমানুপাতিক- বলল চন্দ্রা।
হ্যাঁ, নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব d এবং দূরে সরে যাবার বেগ v হলে v = Hd, এখানে H হচ্ছে হাবল এর ধ্রুবক। এটি হচ্ছে হাবল এর সূত্র। ১৯২০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই সূত্রটি প্রদান করেন। বললেন নীলকান্তবাবু।
বিন্দু আবার এসে বসল, তার হাতে একটা বেলুন, ফুলাবার চেষ্টা করছে।
রেখা বলল-কিন্তু নক্ষত্রগুলো যদি দূরে যেতে থাকে, তাহলে তো একটা আরেকটার গায়ে ধাক্কা লাগতে পারে।
নীলকান্তবাবু বললেন-না, বিষয়টা এরকম নয়। বেলুনটা দে তো মা, বিন্দুকে বললেন। বিন্দু বেলুনটা এগিয়ে দিলে তিনি এতে কলম দিয়ে কয়েকটা ফোঁটা দিলেন।
চেঁচিয়ে উঠল বিন্দু-করো কী বাবা!
কিছু না, বললেন নীলকান্তবাবু। এবার বেলুনটা ফোলা।
বিন্দু ফুঁ দিয়ে ফোলাতে থাকল। দেখা গেল ফোঁটাগুলো আগের থেকে অনেকটা দূরে দূরে চলে গেছে, কিন্তু একটা আরেকটার গায়ে লাগেনি। সবাই ব্যাপারটা বুঝল। বিন্দু ফোলানো বেলুন নাড়াতে থাকল মজা করে। নীলকান্তবাবু আবার শুরু করলেন- ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জর্জ ল্যামাইটারের বক্তব্য ১৯২০ সালের হাবল-এর সূত্রকে সমর্থন করে। এরপর ১৯৩১ সালে ল্যামাইটার আরও বলেন-যেহেতু হাবল-এর সূত্রমতে মহাবিশ্ব ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, তাহলে অনেকদিন পূর্বে নিশ্চয়ই কাছাকাছি ছিল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলল আকাশ। বিষয়টা তো এরকমই মনে হচ্ছে। পরের অংশ আগামীকাল
