রাইসুল ইসলাম আসাদ। এদেশে মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রে একই সমান্তরালে সফল পদচারণায় সমৃদ্ধ জীবন খুব কম শিল্পীর। সেক্ষেত্রে অনবদ্য এক ব্যতিক্রম হলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবদন্তী এই অভিনেতা পেয়েছেন ৬ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক দেশি ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। এ বছর অভিনয়ে দেশের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক পেতে যাচ্ছেন তিনি। সমসাময়িক এ সকল প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন ইত্তেফাকের সঙ্গে
তানভীর তারেক
প্রথমেই অভিনন্দন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা পেয়ে কেমন লাগছে? প্রথম কার কাছ থেকে ফোনে এই অভিনন্দন বার্তাটি পেলেন?
ভালো তো লাগছেই। প্রাপ্তি এক ধরনের আনন্দ দেয়। আর একুশে পদক নিয়ে অনেকের কানাকানি শুনেছিলাম। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে অভিনন্দন জানালেন।
বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকে আপনি মাওলানা ভাসানীর চরিত্রে অভিনয় করছেন। শুনতে চাই এত বড় ক্যানভাসের একটি গল্প ও শ্যাম বেনেগালের টিমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা...
খুব বেশি বলার অবকাশ এখানে নেই। তবে আমি বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক হিসেবে বলতে পারি, এই কাজটিতে থাকতে পেরে ভালো লাগছে। ওদের কাজ খুব গোছানো। আমার প্রথম ধাপে কয়েকদিনের শুটিং হয়েছে। এ মাসে আরো ক’দিনের জন্য শুটিংয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। কাজটা দারুণভাবেই এগুচ্ছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিখ্যাত কিছু চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্রের মাধ্যমের এই যে ব্যাপক পরিবর্তন সারাবিশ্বে, এটাকে কীভাবে দেখছেন? ওটিটি প্লাটফর্ম আসায় বড়পর্দার মোহ থেকে দর্শকরা ক্রমেই সরে আসছে। বিশ্বব্যাপী অস্কার, কান বা বার্লিন ফেস্টিভ্যালেও এখন ওটিটিতে রিলিজকৃত ছবিকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে...
এটা দর্শকের অভ্যেস বদল। একজন অভিনেতা হিসেবে তো আমার ভেতর কোনো পার্থক্য দেখি না। একজন শিল্পীর কাজ অভিনয় করা। সেসব হিসেব বাদ দাও না। সারাবিশ্বে শতশত টিভি চ্যানেলে প্রতিদিন কতগুলো ছবি দেখানো হচ্ছে সে হিসেব আছে? সুতরাং এই অভ্যেসগুলো একদিনে তৈরি হয়নি। আর আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস তো দেড়শ’ বছরও হয়নি। এত অল্প সময়ের একটি বিষয় নিয়ে এখনই এত চিন্তা করার কিছু নেই। সময়ের ওপরে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম।
আপনি, হুমায়ূন ফরিদী, আফজাল হোসেন সমসাময়িক। একে অপরের বন্ধু। খুব জানতে ইচ্ছে করে কেমন ছিল সেই সময় বন্ধুত্বের, আড্ডার সময়কাল। একটা দুটি স্মৃতি কী বলবেন?
হুমম, আমরা সমসাময়িক। আমি অভিনয়ে এলাম ১৯৭২ সালে। আফজাল ১৯৭৪ সালে। ফরিদী মনে হয় ১৯৭৭ বা ১৯৭৮-এ শুরু করলো। আমরা তখন সবাই ব্যাচেলর। জীবনাটাই উদযাপন করতাম অভিনয় দিয়ে। হ্যাঁ, এটা ঠিক পয়সার জন্য আমরা কেউই কাজ করিনি। বরং উল্টো মঞ্চের প্রপস লাগবে বলে বাসা থেকে জিনিসপত্র এনেছি। আর ফরিদী, আফজালের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটাও ছিল একটা অভিনয়ের অভ্যেসের মতো। কাজ করছি থিয়েটারে। বিকেল গড়ালেই চলে এসেছি মঞ্চপাড়ায়। পকেটে হয়তো টাকা নেই। হাঁটতে হাঁটতে পল্টন থেকে টিএসসি চলে এসেছি।
কিন্তু এখন তো ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সকলে অর্থের হিসেবটা মাথায় রাখে—
না, এখানে আমি দোষের কিছু বলবো না। আমরা যে রকমভাবে তখন জীবনটাকে যাপন করেছি সেভাবে তখন ঢাকা শহরে চলা যেত। তখনকার ঢাকায় লিভিং কস্ট কতই বা ছিল! আর এখন ঢাকায় কোনো তরুণ-তরুণীকে খেয়ে ঘুমিয়ে কাটাতে গেলেও কত খরচ দরকার। এখনকার সময়ের বদলেই বদলে গেছে এসব।
আপনি তিন মাধ্যমেই সফল একজন শিল্পী। সে সময় থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করছেন। তখন তো মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রের কাজকে অন্যভাবে দেখতো কেউ কেউ...
হ্যাঁ, এসব অবজ্ঞা শুনেই কাজ করে গেছি। ওসব আমি কোনোকালেই গায়ে মাখিনি। আমার কাজ অভিনয় করা। তখন তো মঞ্চ থেকে টিভিতে কাজ করলেই বলতো, ‘এ কী করছো? থিয়েটার করা ছেলে তুমি টিভিতে কাজ করবে?’ আমাদের রাজ্জাক ভাইও কিন্তু টিভি থেকেই এসেছেন। টেলিভিশনের একটি সিরিয়ালে কাজ শুরু তার। তাই রাজ্জাক ভাইয়ের ভেতরে এসব ছিল না। আর এখন বিষয়টা অন্যরকম হয়েছে। এটাকে মানসিক উত্তরণ বা সময়ের বদল দুটোই বলতে পারো।
জীবনের কোন সময়কালের স্মৃতি আপনাকে তাড়ায়?
দেখো, ওসব স্মৃতি আমাকে তাড়ায়-ফাড়ায় না। আমি নিজের আনন্দে কাজ করে জীবনটাকে বয়ে চলা মানুষ। আমি তো মনে করি আমার জীবনের পুরোটাই অর্জন। জীবনে অভিনেতা হবো এসবই তো ভাবিনি কোনোদিন। তাই পুরোটাই তো বোনাস। মোহের বশে অভিনয় শুরু করলাম, এতগুলো পুরস্কার পেলাম। এখন জানলাম বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার আমাকে একুশে পদক দিচ্ছে। তাই আমার যেমন কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো সময়কালে ফেরারও কোনো ইচ্ছে তাড়িত করে না। আর এই যে বললে আমার, আফজাল, ফরিদীর কথা। সেসময় এই তিনজনের বাইরেও অনেক গুণী শিল্পী ছিল। কই তাদের নিয়ে তো বলো না। লেখো না! আমার কিছুটা রাগ হয় এসব দেখলে। একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে। অনেক বড় বড় অপারেশন করেছেন এমন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোনো আলোচনা শুনিনি। মুক্তিযোদ্ধারা যখন অন্য মাধ্যমে এসে কিছুটা নাম করে তখনই তাদের নিয়ে চলে আলোচনা!
বঙ্গবন্ধুর সময়কালে আপনার স্বর্ণালি স্মৃৃতির কথা শুনতে চাই—
সেই সময়কালে ছিলাম বলেই নিজের জন্ম, জীবনকে ধন্য বলে মনে হয়। ভেবে দেখো, হাজার বছরেও কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হবে না। আমার ঐ বয়সে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি তাদের মতো দুর্ভাগা কেউ নেই। বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ছিলাম। তবে খুব মনে পড়ে রমনার সামনে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার দিনের কথা। আমরা ছিলাম শেষ ব্যাচ। তখন এক অন্যরকম সময়!
সবশেষে এই দেশ শিল্প সংস্কৃতি ও তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে কিছু শুনতে চাই—
এই দেশ সমৃদ্ধ হচ্ছে। এখন একাট্টা থাকতে হবে আমাদের। এভাবে এগিয়ে গেলে ২০ বা ৩০ বছর পর একটা স্বপ্নের জায়গায় আমরা দেশকে দেখতে পাবো। আর তরুণদের উদ্দেশ্যে একটিই কথা, কাজ করে যাও, কোনো শর্টকাটের কথা চিন্তা করবে না।
