দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫০

অর্থনৈতিক উদারনীতি বা মুক্ত অর্থনীতির চিন্তা মূলত ব্যক্তিস্বাধীনতার মনন, মানসিকতা ও চেতনা থেকেই উদ্ভূত। এ চেতনা থেকেই দেশে দেশে সাধিত হয়েছে অর্থনৈতিক সংস্কার। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি হস্তক্ষেপ হ্রাস করা হয়েছে। মূল্যের সমতা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য নির্ভর করা হচ্ছে খোলাবাজার ব্যবস্থার ওপর। মনে করা হচ্ছে, এতে উত্পাদক ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবে। মুক্তবাজার ব্যবস্থাই ভারসাম্য রক্ষা করবে জাতীয় অর্থনীতির। প্রকৃত প্রস্তাবে সব সময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুক্তবাজার অনেক সময় স্বতশ্চলভাবে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে না। তাছাড়া মুক্তবাজারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয় না। সংকটকালীন মুনাফা অর্জন থেকে লোভী ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত করা যায় না। এর জন্য দরকার হয় হস্তক্ষেপ। প্রয়োজন পড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যারা এ সত্যটিকে মেনে নিতে চান না। বাজার কুশীলবরা সব সময়ই যুক্তিযুক্ত আচরণ করবেন বলে তারা ধারণা পোষণ করেন। এর ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারকে প্রায়ই নিষ্ক্রিয় থাকার পরামর্শ দেন তারা। এ সুযোগে অতি মুনাফা অর্জনকারী মজুতদার ও ব্যবসায়ীরা বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারেন। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ভোক্তারা। এমতাবস্থায় সরকার শুধু রেফারির মতো আচরণ করবে আর বাজার-কুশীলবরা তাদের ইচ্ছেমতো খেলে যাবে—এমন যুক্তি ধোপে টেকানো কঠিন। দুই বছর ধরে পেঁয়াজের উচ্চমূল্য, আলুর মূল্যবৃদ্ধি এবং চালের বাজারে অস্থিরতা মূলত বাজার-কুশীলবদেরই কারসাজি। উত্পাদন হ্রাস কিংবা পণ্যসংকট এ উচ্চমূল্যের জন্য মোটা দাগে দায়ী নয়।

প্রথমে পেঁয়াজের সাম্প্রতিক স্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কথা আলোচনা করা যেতে পারে। এ পণ্যটিতে গত ১০ বছরে আমাদের উত্পাদন বেড়েছে ৬০ শতাংশ। তবু এ পণ্যটিতে ঘাটতি আছে আমাদের। এ ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন। এ ঘাটতি মেটানোর জন্য আমরা পেঁয়াজ আমদানি করে থাকি। বিশেষ করে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ওপর আমরা পেঁয়াজ আমদানির জন্য অতিশয় নির্ভরশীল। সে দেশে পেঁয়াজের প্রধান উত্পাদনকারী অঞ্চল মহারাষ্ট্রে গত বছর (২০১৮-১৯) অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে পণ্যটির উত্পাদন মার খায়। তাতে স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধি পায় পেঁয়াজের। ফলে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পণ্যটির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে। তাতে বাংলাদেশে রাতারাতি পেঁয়াজের দাম অনেক বেড়ে যায়। একসময় তা প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বাজারে। বিকল্প উত্স থেকে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানি করে অভ্যন্তরীণ বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রায় ৪০ মাস সময় লেগে যায় আমাদের। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও গুটিকতক আমদানিকারকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ আছে। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটির সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যবস্থাপনা সমস্যাও এর জন্য দায়ী।

এবারও প্রায় একই কারণে, একই সময়ে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ এ নিষেধাজ্ঞার কথা আমরা জানতে পারি। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকেই আমাদের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই কেজিপ্রতি তা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছে যায়। এটি ব্যবসায়ীদের কারসাজি। সাময়িক সরবরাহের সংকট সৃষ্টি করে তারা অতিমুনাফা অর্জনের সুযোগ নেয়। ইতিমধ্যে বিকল্প উত্স থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয় সরকার। দেশের অভ্যন্তরে চলে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ। তাতে এই সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসে যায়। তবে টিসিবি কর্তৃক অতি অল্প মাত্রায় বাজার হস্তক্ষেপের কারণে দীর্ঘদিন পেঁয়াজের কেজিপ্রতি মূল্য ৬০-৭০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

গত ১২ বছরে দেশে পেঁয়াজের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৭ দশমিক ৩৫ লাখ টন থেকে ২৪ লাখ টনে। একই সঙ্গে আমদানিও বেড়েছে ১ দশমিক ৩৫ লাখ টন থেকে প্রায় ১০ লাখ টনে। সেই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২২২ কোটি টাকা থেকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। এর সঙ্গে অপচয় ৩০ শতাংশ যোগ করে সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ লাখ টন। আমাদের মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন ২৪ লাখ টন বাদ দিলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ টন, যা মোট চাহিদার ২৪ শতাংশ মাত্র। এটুকু পেঁয়াজের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। তবে পেঁয়াজ আমদানির উত্স বহুমুখীকরণও আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। সংকটকালে বাজারে বড় আকারে হস্তক্ষেপ করাও সম্ভব। এর উত্পাদন বাড়িয়ে দ্রুত স্বয়ম্ভরতা অর্জন করাও কঠিন কিছু নয়। পেঁয়াজ নিয়ে প্রতি বছর এ ধরনের অস্থীরতা কোনোক্রমেই কাম্য নয়।

আলু উত্পাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। স্বাধীনতার পর গত অর্ধশতাব্দীতে আলুর উত্পাদন বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ হারে। ২০১৯-২০ সালে আলুর উত্পাদন ছিল প্রায় ৯৬ লাখ টন। দেশের মানুষের ভোগ চাহিদা মিটিয়ে এবং করোনা পরিস্থিতিতে ত্রাণ হিসেবে আলু বিতরণ, আলু রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি, বীজ হিসেবে আলু সংরক্ষণ ইত্যাদির পরও ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেশে আলুর উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন। তার পরও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আলুর মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। এবার আম্ফান ও বারবার বন্যার ফলে শাকসবজির উত্পাদন বিঘ্নিত হয়েছে। তাতে এর মূল্য বেড়েছে। এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে আলুর কদর বেড়েছে। এ সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেছে হিমাগারের মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তারা ধীরে আলু ছেড়েছে বাজারে এবং মূল্য বাড়িয়েছে। এক পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি কেজি ৫৫ টাকায়। এ মূল্যবৃদ্ধি পণ্যটির উত্পাদন ঘাটতির জন্য নয়, ব্যবসায়ীদের অসাধু আঁতাঁত ও কারসাজির জন্য। এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল অপর্যাপ্ত এবং অনেকটাই অকার্যকর। টিসিবি খোলাবাজারে আলু বিক্রি করেছে ২১৫.৫ টন, যা খুবই কিঞ্চিতকর।

চাল উত্পাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভর। গত অর্ধশতাব্দীতে চালের উত্পাদন বেড়েছে বছরে গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ সালে দেশে ভোগের চাহিদা মিটিয়েও চালের উদ্বৃত্ত ছিল প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ লাখ টন। এর পরও এবার চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক, অনাকাঙ্ক্ষিত। মোটা চালের দাম ক্ষেত্রবিশেষে ছাড়িয়ে গেছে প্রতি কেজি ৫০ টাকারও ওপরে। এর পেছনে অলক্ষ্যে কাজ করেছে চাল ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেট ও বড় চাতালের মালিকরা। গত বোরো মৌসুমে তারা চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সরকারকে প্রতিশ্রুত পরিমাণে চাল সরবরাহ করে প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে দেয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাজার হস্তক্ষেপ সম্ভব হয়নি। গত আমন মৌসুমে পরপর বন্যার কারণে উত্পাদন কম হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টন। এ সময় সরকারের মজুত নেমে আসে প্রায় তলানিতে, মাত্র ৫.৪ লাখ টনে। এমন পরিস্থিতিতে চালের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে বর্তমানে আমদানি শুরু হওয়ায় অচিরেই বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে বলে আশা করা যায়। এর জন্য আমদানিকৃত চাল বাজারে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত আরো আগে নিলে ভালো হতো।

গত অর্ধশতাব্দী ধরে চালের বাজার মূল্য (nominal price) প্রকারভেদে গড়ে প্রায় ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। কিন্তু প্রকৃত মূল্য (real price) প্রায় ২ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে। মাঝেমধ্যে চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকের কোনো লাভ হয় না। কারণ, ধান কাটার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় ৭৭ ভাগ বাজারজাত উদ্বৃত্ত তারা বিক্রি করে দেন। বাকি যা ঘরে থাকে, তা দিয়ে কৃষকরা বাজারমূল্যকে প্রভাবিত করতে পারেন না। বাজারকে প্রভাবিত করে মূলত ব্যবসায়ীরা, যারা কৃষকের কাছ থেকে স্বল্প দামে উদ্বৃত্ত কিনে নিয়ে মজুত করে রাখে এবং তাদের উপযুক্ত সময়ে তা বাজারে ছেড়ে অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নেয়।

কৃষকদের কাছ থেকে সরকারের অভ্যন্তরীণ চাল সংগ্রহ বাড়াতে হবে। প্রতি বছর কম পক্ষে ২৫ লাখ টন চাল মজুত করতে হবে সরকারি গুদামে, কোনো মাসেই তা সাড়ে ১২ লাখ টনের নিচে নামতে দেওয়া যাবে না। অভ্যন্তরীণ সংগ্রহে ঘাটতি থাকলে দ্রুত আমদানির মাধ্যমে তা পূরণ করে নিতে হবে। যাতে সরকারের পক্ষে কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হবে বাজারে।

অতি সম্প্রতি চালের আমদানি শুল্ক ৬২.৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ২৫ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। পেঁয়াজের আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশে। তবে নিম্ন হারে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে অবাধ আমদানির সুযোগ সৃষ্টি কাম্য হতে পারে না। তা দেশীয় উত্পাদকের স্বার্থকে বিনষ্ট করতে পারে। উত্পাদনে নিরুত্সাহিত করতে পারে দেশের কৃষকদের।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘খাদ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেদেরই উত্পাদন করতে হবে। আমরা কেন অন্যের কাছে ভিক্ষা চাইব। আমাদের উর্বর জমি, আমাদের অবারিত প্রাকৃতিক সম্পদ, আমাদের পরিশ্রমী মানুষ, আমাদের  গবেষণা-সম্প্রসারণ কাজের সমন্বয় করে আমরা খাদ্যে স্বয়ম্ভবতা অর্জন করব। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। গত কয়েক বছর ধরে পেঁয়াজের চালান নিয়ে আমাদের বড় বেশি ভোগান্তি হয়েছে। এবার আলু এবং চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্যও আমাদের ভোক্তাদের বাড়তি ভোগান্তি হয়েছে। এ অবস্থার উন্নতির জন্য পণ্যগুলোর উত্পাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য আমাদের আমদানি বিকল্প নীতি গ্রহণ করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যগুলোর উত্পাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

n লেখক :কৃষি অর্থনীতিবিদ