সড়ক দুর্ঘটনা আজকালের স্বাভাবিক খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার খবর আমাদের কানে চলে আসে। মৃত্যু অনিবার্য। কেউ তা থামাতে পারবে না। তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। দিনে হাজারো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিহত হচ্ছে মানুষ। মায়ের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েই সড়কপথে দুর্ঘটনায় নিহত ছেলে, বিদেশফেরত মানুষের মধ্য পথেই দুর্ঘটনায় নিহত, রাস্তার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় গাড়ির ধাক্কায় নিহত যুবক—এমন হাজারো দুর্ঘটনার সংবাদ আমাদের কানে আসে; কিন্তু এর পেছনে দায়ী কে বা কারা কিংবা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার পেছনের মূল কারণ কী—তা আমরা অনেকেই জানি না।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৬৮৬ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেকাংশেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেছে। সড়ক দুর্ঘটনা আজকাল শুধু কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং অনেকাংশেই এটা দুর্যোগের পর্যায়ে চলে গেছে; কিন্তু বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ হলো অকার্যকর সড়কপথ। যার কারণে প্রচুর যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার মতো অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখে ঝুঁকে পড়ছে। সড়কনিরাপত্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম-দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তাদের জবাবদিহিতার অভাবে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় প্রাণ যাচ্ছে অগণিত। ফুটপাত সাধারণত ব্যবহার হয় জনগণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে। সড়কের দুই পাশে প্রায় পাঁচ ফুট প্রশস্ত ফুটপাত অবৈধ দখলে। এমনকি রাস্তায়ও দোকানপাট বসছে। ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা হাঁটতে পারছেন না। এমনকি রাস্তা দিয়েও চলাফেরা কঠিন।
কিন্তু আজকে ফুটপাত ব্যবসা-বাণিজ্যে ভরপুর। যার কারণে মানুষের চলাচলের পথ একেবারেই বন্ধ। ‘ফুটপাত যে যার মতো করে দখল করেছে। পথচারীদের ভোগান্তি দেখার সময় কারও নেই। ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয়। যার কারণেই প্রতিনিয়ত সংঘটিত হচ্ছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা। স্থায়ীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফুটপাত কখনোই পথচারীদের ব্যবহার উপযোগী হবে না। অনেকেই গাড়ির হেল্পার থেকে চালক হয়েছে। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। লেখাপড়াও নেই তেমন। অনেকেই অশিক্ষিত। কোনোরকমে নামদস্তখত করতে পারে। অথচ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তাদের হাতেও চলে আসে অরিজিনাল লাইসেন্স।
সড়কে নামলে দেখা যায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছড়াছড়ি। যাদের পরীক্ষা করার মতো অফিস থাকলেও প্রয়োগ নেই। ঘুষের কারণে যা পার পেয়ে যায়। সড়কে এখনো অনেক ফিটনেসবিহীন গাড়ি চোখে পড়ে। তবে ফিটনেস না থাকলেও অনেক গাড়ি ফিটনেস সার্টিফিকেট পেয়ে যায়। চোখের দেখাতেই দিয়ে দেওয়া হয় ফিটনেস সার্টিফিকেট। চালকরা ঘরে বসেই পেয়ে যান ড্রাইভিং লাইসেন্স। আবার অসংখ্য চালক মদ্যপানের মধ্যেই গাড়ি চালান। যার কারণে সড়কে দুর্ঘটনার নজির অনেক। যা হরহামেশা আমাদের চোখে পড়ে। মদ্যপ অবস্থায় বাজি ধরে রেস করতে গিয়ে, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কেবল মজা করতে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের শিকার হচ্ছেন পথচারী থেকে শুরু করে ফুটপাতের সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো বেপরোয়া গাড়ি চালানো। যথাযথ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যদি বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সড়ক দুর্ঘটনার মতো নির্মম ঘটনা হরহামেশা কম দেখা যাবে; কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে দুর্ঘটনা ঘটেই যাবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির ফিটনেস ভালোভাবে পরীক্ষা করে সড়কে নামানো প্রয়োজন। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কোনো গ্যারান্টি নাই। যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে পারে। অযোগ্য বা অদক্ষ চালকের লাইসেন্স বাতিল করলে সড়কে তারা নামার সাহস পাবে না। দক্ষ চালকের হাতে গাড়ি সবসময় নিরাপদ থাকে। চালক নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোর সময় ভালোমন্দ বিচার করার ক্ষমতা থাকে না। যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
