বাজারে সবজির দাম কমার স্বস্তি হারিয়ে গেছে ভোজ্য তেলের চড়া দামে। লাগামহীনভাবে বাড়ছে রান্নার অতি প্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় সয়াবিন ও পামঅয়েলের সরবরাহ কম এমন অজুহাতে দেশের বাজারে গত প্রায় দুই মাস ধরেই ভোজ্য তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
এদিকে ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে গত ১৫ জানুয়ারি সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বৈঠক করলেও বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তখন বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের মূল্য কম-বেশি হওয়ার কারণে দেশে তা উঠা-নামা করে। তাই সমস্যার গভীরে গিয়ে আমরা সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু বৈঠকের পর গত ২০ দিনে ভোজ্য তেলের দাম আরো বেড়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজারে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন কোম্পানিভেদে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। আর পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম রাখা হচ্ছে কোম্পানিভেদে ৬২০ থেকে ৬৮০ টাকা। অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা ও পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ৫৮০ থেকে ৬৩০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। গতকাল বাজারে প্রতি লিটার পামসুপার ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, পামঅয়েল ১০০ থেকে ১০২ টাকায় বিক্রি হয়। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসেবে গত এক বছরে সয়াবিন তেলে ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ ও পামঅয়েলে ২২ দশমিক ৮৪ শতাংশ দাম বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কারসাজি করে তাদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে। ভোক্তাদের জিজ্ঞাসা, প্রতি বছর রমজানে চাহিদা বাড়ায় ভোজ্য তেলের দাম বাড়ে—এমন কথা বলা হয়। কিন্তু এখন তো রমজান না। আবার ব্যবসায়ীদের কাছে আগের কেনা ভোজ্য তেলও রয়েছে। তাহলে দাম এত বাড়ছে কেন?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে চাহিদার ৯০ শতাংশ ভোজ্য তেল আমদানি করা হয়। বাংলাদেশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সয়াবিন তেল আমদানি করে। কিন্তু আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরে ভোজ্য তেল মিলগুলোতে শ্রমিক ধর্মঘট চলছে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পামঅয়েল আমদানি করা হয়। এই দুটি দেশে ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে পামঅয়েলের মৌসুম শুরু হবে। কিন্তু দেশ দুটি আশঙ্কা করছে এ বছর তাদের পামঅয়েলের উত্পাদন কম হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চীন প্রচুর পরিমাণে ভোজ্য তেল আমদানি করছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার তুলনায় ভোজ্য তেলের সরবরাহ কম। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। এর সঙ্গে কারসাজির কোনো কারণ নেই।
এদিকে ভোজ্য তেলের পাশাপাশি বাজারে আটা, ময়দা, ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। সব ধরনের আটা, ময়দায় প্রতি কেজিতে দুই টাকা বেড়ে সাদা আটা ৩০ থেকে ৩২ টাকা, প্যাকেট আটা ৩২ থেকে ৩৫ টাকা, খোলা ময়দা ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা ও প্যাকেট ময়দা ৩৮ থেকে ৪৬ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ডিমের হালিতে দুই টাকা বেড়ে ৩০ থেকে ৩২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ টাকা। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয় ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা।
তবে কমেছে সরু চালের দাম। কেজিতে দুই টাকা কমে সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৮ থেকে ৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া অন্য চালের মধ্যে পাইজাম/লতা ৫২ থেকে ৫৮ টাকা, মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে বাজারে শীতকালীন সবজির ব্যাপক সরবরাহ থাকায় সবজির দাম এখন বেশ সস্তা। গতকাল বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজির মধ্যে নতুন আলু ১৫ থেকে ২০ টাকা, শিম ২০ থেকে ৩০ টাকা, মুলা বরবটি ৪০ টাকা, করলা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ঝিঙা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কচুর লতি ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি ও ব্রকলি আকারভেদে ১৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে এখনো কাঁচা মরিচের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। আর দেশি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা ও আমদানিকৃত পেঁয়াজ ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
