প্রবীণ সংগঠন ও সামাজিক কেন্দ্র

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:১০

সমাজ এবং সভ্যতার উন্নয়ন ও বিকাশে যাদের ভূমিকা ছিল প্রধান ও অগ্রগণ্য তারাই আজ প্রবীণ। শুধু বয়সের কারণে বর্তমানে এই বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠী অবহেলিত, বঞ্চিত, যাবতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা বহির্ভূত। চলার পথে যে দক্ষতা ও প্রজ্ঞা সে অর্জন ও ব্যবহার  করেছে তা কাজে লাগানো এবং এমনকি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রয়োজনে তা রেখে যাওয়ার সুযোগটুকু পর্যন্ত আজ তার নেই। এ উলটো ধারা থেকে সমাজকে রক্ষা করা দরকার। আর সেটা করতে প্রথমেই দরকার প্রবীণদের নিজেদের প্রতি আস্থা ও মনোবল ফিরিয়ে আনা। প্রবীণদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের উদ্যোগের ভিত্তিতে তাদেরকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত করার পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিচ্ছিন্নভাবে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ বা সংগঠিত করা।

প্রবীণবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রবীণদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের বিভিন্ন অবদানকে মূল্যায়ন এবং টেকসই করার জন্য প্রবীণ সংগঠন গঠন করা প্রয়োজন। সংগঠনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুবিধাবঞ্চিত প্রবীণ নারী-পুরুষকে সংগঠিত করার মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের দক্ষতা এবং ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি কমিউনিটি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন সেবা থেকে প্রবীণ উপযোগী সুবিধাদি পাওয়ার বিষয়ে প্রবীণদের সুযোগ এবং সমন্বয় সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সহায়তা করা। গ্রাম ও ওয়ার্ডভিত্তিক প্রবীণ কমিটি/সংগঠনের পাশাপাশি উচ্চতর কমিটি হিসেবে ইউনিয়ন প্রবীণ কমিটি বেশি কার্যকরী হতে পারে। কমিটিগুলো প্রবীণদের বাড়ির উঠোন, ঘর, স্কুল ইত্যাদি স্থানে তাদের মাসিক সভা ও অন্যান্য কার্যক্রমের আয়োজন করতে পারে।

প্রবীণদের সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে ও সংগঠনের স্থায়ী একটি প্ল্যাটফরম হিসেবে দৃশ্যমান করার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থা এগিয়ে আসে এবং প্রবীণ কমিটি ও কমিউনিটির প্রবীণদের সহায়তা নিয়ে ইউনিয়নগুলোতে ‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। যেহেতু প্রবীণদের কথা বলার জায়গা কম এবং পরিবার ও সমাজে তারা অনেকটাই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন, তাই বিভিন্ন চাওয়াপাওয়া ও বিনোদন থেকেও তারা বঞ্চিত হন। ফলে ক্রমশই তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার এই বিপর্যস্ততা থেকে প্রবীণদের একটু বিনোদন আর স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে মানসিকভাবে প্রশমিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্রগুলো তৈরির জন্য প্রবীণরাই তাদের নিজেদের জমি দান করেছেন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক সংস্থাকে। এই জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে কেন্দ্রসমূহ, কেন্দ্রের স্থাপনার কাজে প্রাথমিক পর্যায়ে আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। পরবর্তীকালে প্রবীণ নেতৃবৃন্দ কমিউনিটির স্বচ্ছল ব্যক্তি, চেয়ারম্যান, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অনুদান সংগ্রহ করে কেন্দ্রের স্থাপনার কাজ সম্পন্ন করে। সামাজিক কেন্দ্রগুলো পরিচালনার জন্য আর্থিক উত্স মূলত কমিটির নিজস্ব সঞ্চয় এবং বিভিন্ন অনুদান থেকেই সংগৃহীত হয়। সংগঠনের প্রবীণ প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কেন্দ্রগুলোর দেকভাল ও সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিয়ে থাকে।

দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা বিবেচনায় সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত শ্রেণিকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তকরণের অংশ হিসেবে পল্লি কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ‘প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক সুরক্ষায় প্রবীণদের সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে পিকেএসএফ তাদের সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নে ‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছে।

প্রবীণরা এই প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত মাসিক সভার আয়োজন করে, পত্রিকা পড়ে ও টেলিভিশন দেখে, বিনোদনের জন্য বিভিন্ন ঘরোয়া খেলাধুলা ও গানবাজনার আয়োজন করে সময় কাটান। এছাড়া একজন ডাক্তারের মাধ্যমে প্রবীণদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ফিজিওথেরাপিস্টের মাধ্যমে প্রবীণদের ফিজিওথেরাপি প্রদানসহ শরীরচর্চার বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়।

‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নবীনরাও এই সব কেন্দ্রে এসে প্রবীণদের আড্ডায় অংশগ্রহণ করছে, ফলে কমিউনিটিতে আন্ত-প্রজন্ম সম্পর্ক সুদৃঢ় হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন, মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।

শুধু কিছু সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত এই কর্মসূচি সুবিধাবঞ্চিত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকর এক ক্ষুদ্র পদক্ষেপ মাত্র। অন্যান্য সংস্থাও যদি তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রবীণদের গ্রহণযোগ্যতাকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কাজ করে তাহলে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রবীণদের সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে ‘প্রবীণ সামাজিক কেন্দ্র’ গড়ে তোলা সম্ভব হবে যা—একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপরেখা তৈরিতে সহায়ক হবে। আর এভাবেই হয়তো ২০৫০ সালে প্রবীণ জনসংখ্যার রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ এবং SDG এর লক্ষ্যমাত্রাকে সামলে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

n লেখক : অ্যাসিসট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)