পারিবারিক কলহে খুন হন এক নারী। ১০ দিন পর উদ্ধার হয় তার গলিত মরদেহ। লাশ উদ্ধারের পর প্রস্তুত করা হয় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গলিত মরদেহ একজন অজ্ঞাতনামা নারীর। তবে নিহতের হাতে থাকা সোনালি রঙের চুড়ি দেখে তার বাবা-মা শনাক্ত করেন, এটা তাদের মেয়ের মরদেহ। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে নিহত নারীর পরিচয়ও নিশ্চিত করেন তার স্বামী। কিন্তু পরবর্তীকালে ডিএনএ পরীক্ষায় বদলে যায় মৃত ঐ নারীর পরিচয়। ডিএনএ প্রতিবেদনে বলা হয়, অজ্ঞাত মৃতদেহের হাড় থেকে একজন পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। এতে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়, অজ্ঞাত মৃতদেহ মামলার বাদীর জৈবিক সন্তান নয়। তবে নারীর মরদেহের নমুনা দেওয়া হলেও ডিএনএ পরীক্ষায় কীভাবে পুরুষের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেল, সেটাও পরিষ্কার করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, লাশের ময়নাতদন্ত শেষে নমুনাস্বরূপ ডান হাতের কনুইয়ের নিচের দুটি হাড় সংরক্ষণের জন্য ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ঐ ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ডিএনএর জন্য সংরক্ষিত আলামতের স্থানটিতে দেখা যায়, অন্তত হাজার খানেক নমুনা আলামত পলিথিনের ব্যাগে ও কাগজে মোড়ানো খামে পৃথক পৃথকভাবে রাখা হলেও শনাক্তকরণ লেভেলবিহীন অবস্থায় রয়েছে, যা থেকে অত্র মামলার সঠিক আলামত চিহ্নিত করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে মনে হয় না।
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে ডিএনএ প্রতিবেদনের এই অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরে হাইকোর্টে জামিন চান নিহতের স্বামী উমর ফারুক দোলন। জামিন না দিয়ে ছয় মাসের মধ্যে মামলার বিচার সম্পন্নের জন্য সিলেটের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. ইব্রাহিম মিয়াকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বিচারের রায় কী হলো, সেটা প্রতিবেদন দিয়ে উচ্চ আদালতকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল রবিবার এই আদেশ দেয়।
পারিবারিক কলহে পুতুল বেগমকে (২১) হত্যা করেন তার স্বামী উমর ফারুক দোলন (২৭)। ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিলেটের জৈন্তাপুরের মোকামবাড়ী আলুবাগানসংলগ্ন টিলার পাদদেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরে লাশ নিচের জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার ১০ দিন পর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টে বলা হয়, মৃতের ডান হাতে একটি সোনালি রঙের চুড়ি এবং বুকের অংশে লাল রঙের অন্তর্বাস থাকায় এটা একজন নারীর কঙ্কাল বলে প্রতীয়মান হয়।
এ প্রসঙ্গে দোলনের আইনজীবী শিশির মো. মনির ইত্তেফাককে বলেন, ভিকটিমকে যে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেল না, এর পুরো দায় তদন্ত কর্মকর্তার। এখন প্রশ্ন, ঐ নারীকে কে হত্যা করল? আর যদি মেরেই থাকে, তাহলে তার মরদেহ কোথায়? সন্দেহাতীতভাবে যদি কোনো মামলা প্রমাণ করা না যায়, তাহলে এর সুবিধা পাওয়ার হকদার আসামিপক্ষ। তবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলেন, ‘আসামি দোলন হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। আর ডিএনএ রিপোর্টে যে ভিন্নতা, সেটা কেন হয়েছে, চার্জশিটে তার পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। আমরা আশা করছি আসামির সর্বোচ্চ শাস্তিই হবে।’
