অবারিত দরজা

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:০৪

বয়স যে শুধু সংখ্যার সমাহার, এই মুহূর্তে সম্ভবত তার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রাণপুরুষ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। নির্মেদ। নীরোগ। প্রাণচঞ্চল। স্টাইলিশ এবং সদা ব্যস্ত মানুষ। গতকাল ছিল তার জন্মদিন।  কয়েক শ মাইল দূরে থেকে অনুভব করছি, শোভিত আড়ম্বরে তাকে ঘিরে মেতে উঠবেন তার সহকর্মী, বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা এবং সবার মঞ্জু ভাই প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দেবেন-- আচরণের ধর্মে, যাপনের কর্মে তিনি যৌবনের, আত্মনিষ্ঠার আর আত্মসম্ভাষণের এক অপ্রতিহত বিনম্র অগ্রদূত। দেহের বয়স তার যাই হোক, তার মনের বয়সকে ছুঁয়ে আছে পরিণত, উদ্দীপ্ত ১৮, এখনো। চারপাশে আমরা সাধারণত দেখি, ৬০ পেরোলেই অনেককে বয়সের ভার, ক্লান্তি, অপ্রশান্তি তাড়া করতে থাকে, প্রায়ই বলে ফেলেন তারা—আমরা  আর কদিন, ক্রমশ অস্তাচলের দিকে এগোচ্ছি। এসব উচ্চারণ একধরনের আক্ষেপ আর অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গী নয় কি? জীবনকে যিনি ভালোবাসেন, তিলে তিলে অনুভব করেন তার ভাব, তার প্রাহ, তার অপর্যাপ্ত দীপ্তি, তাকে কখনো বলতে শোনা যায় না—‘বুঝতে হবে আমার বয়স হয়েছে। সমাজও নিষ্ঠুরভাবে তাদের বুঝিয়ে দিতে চায়—পথ ছাড়তে হবে, অবসর নিতে হবে, প্রবীণ হয়ে যাচ্ছ। তোমার জন্য বাসে-ট্রেনে, যাপনের নানা স্তরে এই এই সুযোগ রইল। এসব সশ্রদ্ধ সুযোগ বিস্তারের আড়ালে কোথাও কোথাও কিঞ্চিত্ এড়িয়ে চলার চিহ্ন কি উঁকি দেয় না? আমরাও প্রচলিত ধারণার প্রভাবে কি ভুলে যাই না—ব্যক্তিসত্তা আমৃত্যু যে ধ্যানকে ধারণ করে বেঁচে থাকতে চায়, তা এক অনিঃশেষ চেতনা, যেখানে মৃত্যু পরাজিত। মৃত্যু তাত্ক্ষণিক একটি  ঘটনামাত্র। জীবন মানেই জেগে থাকা। জীবন মানেই সময় আর ভবিষ্যতের বন্ধন। জীবন মানেই আয়ত্তাধীন শক্তির বিন্যাস ও উপাসনা।

আমাদের সৌভাগ্য, জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আনুপূর্বিক জীবনচর্যা দেখে আমরা উপলব্ধি করি যে, তার স্বভাবধর্ম—ঐ ছাত্রজীবন থেকে, ছাত্ররাজনীতি থেকে, বিদেশের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা থেকে, দেশে ফিরে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে তার সংযোগ থেকে—পত্রিকা সম্পাদনা ও ব্যবসায়ের তদারকি পর্যন্ত যাবতীয় কাজে যৌবনবোধ আর যাপনের শোভনকেই ক্রমাগত উত্তরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ আরেক অবিরাম, বিরল পদযাত্রা। যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা জিজ্ঞাসু ছাত্রের মতো কিংবা ছাত্রের অনুশীলনে ছড়িয়ে থাকে বিনয়ী, স্নেহপ্রবণ, বন্ধুবত্সল শিক্ষক হয়ে ওঠার নিরন্তর আগ্রহ। তার ছাত্র জমানার বৃত্তান্ত আমরা জানি, খবর রাখি দেশের নির্মাণপর্বের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে তার সক্রিয় সংযুক্তির ধারাবাহিক ইতিহাস—যেখানে তিনি বাংলাদেশের নেপথ্য স্থপতি আর বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নহীন সহযোগী, প্রবাদপ্রতিম তফাজ্জল হোসেনের (মানিক মিয়ার) পুত্র পরিচিতিকে ছাড়িয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলেছেন অন্যভাবে, অন্য ভঙ্গিতে এবং সামাজিক পছন্দ-অপছন্দকে  গুরুত্ব দিয়ে নির্মাণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত সচেতন কর্মবলয়। ব্যক্তিপ্রতিভার বিকাশে পারিবারিক অথবা সমষ্টির উত্তরাধিকার অনস্বীকার্য। ব্যক্তিসত্তা যখন হয়ে উঠতে চায়, তখন তার আহরণ শুরু হয় পরিবার থেকে, তারপর সমাজ থেকে, ঘটনাপ্রবাহ থেকে। এদিক দিয়ে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু অবশ্যই ভাগ্যবান। কিন্তু ভাগ্যের উত্তরণ আর শ্রীবুদ্ধিতে তার নিজস্বতা, তার সচেতন প্রচেষ্টা, তার আত্মার সক্রিয়তা সবার ওপরে। ২৬ বছর বয়সেই ইত্তেফাকের মতো অভিজাত দৈনিকের সম্পাদক (৭২ সালে)—কনিষ্ঠতম কাঁধে বয়োজ্যেষ্ঠের দায়িত্ব তখন প্রায় অভাবনীয়। দেশ তখন সদ্য স্বাধীন। বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতা দেশের পরিচালক। রাজনীতি মোড় ঘোরাচ্ছে। সমাজ স্বপ্ন দেখছে, সংবিধান প্রণীত হচ্ছে—নব-উত্থিত দেশ, সমূহ ভাঙন অতিক্রম করে নতুন সূর্যোদয়ের দিকে হাঁটছে, ঘরে-বাইরে শত্রুদের কোলাহল অব্যাহত। এরকম অবস্থায় বাংলাদেশের আত্মার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী দৈনিকের প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন সহজসাধ্য ছিল না। প্রতিমুহূর্তে প্রতি স্পর্ধাময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরকম পরিস্থিতিতেই সংবাদপত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন এবং অর্পিত দায়িত্বকে মুক্ত দায়িত্বের চেহারা দিয়ে গণমাধ্যমের সত্যের শর্তকে উঁচিয়ে ধরতে পিছুপা হলেন না। বঙ্গবন্ধুর বন্ধুপুত্র, স্নেহধন্য, ষাটের দশকে আওয়ামী লীগের ছাত্ররাজনীতির অন্যতম প্রধান কারিগর—এসব পরিচিতিকে স্তিমিত রেখে তাকে ভাবতে হয়েছে, প্রতিবেশকেও ভাবাতে হয়েছে যে, সংবাদপত্র সবার। দরজা তার সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত।

মন্ত্রিত্বে ১৮ বছর, শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় প্রায় যুগ, এরশাদের আমলে আশির দশকেও প্রভাবশালী দক্ষ মন্ত্রী। মন্ত্রিত্ব আর সম্পাদকীয় দায়িত্ব—পরস্পরবিরোধী, ন্যায় ও নীতিবিরোধী—এ কথা ভেবেই সংবাদপত্রের নৈমিত্তিক কাজ থেকে খানিকটা দূরে গিয়েও তার স্বাভাবিক ধর্ম থেকে বিচ্যুত হননি। ইত্তেফাক যথাসম্ভব সমাজের মুখপত্র, সময়ের মুখপত্র এবং মতামত প্রকাশের অবাধ প্রবক্তার চেহারা অক্ষুণ্ন রেখেছে তারই স্বাস্থ্যময় নির্দেশে। এখানেই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু অন্যরকম। তার আত্মতার মতোই স্বপ্রাণিত ব্যতিক্রম।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মেধাবী ছাত্র তিনি। চার মহাদেশের ঘটনাপ্রবাহে খেয়াল তার অহরহ। বিদেশের ঘরোয়া রাজনীতি কী হবে, কী হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপহীন মনোভাব স্পষ্ট; আবার দেশে-বিদেশে যে রাজনীতি সভ্যতার শত্রু, মানবতার শত্রু, তাকে কশাঘাত করতে সংশয়হীন, কঠোর তার মনোভাব। এখানেই তিনি একজন আপসহীন শিক্ষক আবার নিয়মিত ছাত্রও। কেন ছাত্র বলতে হচ্ছে? যা ঘটছে, কীভাবে ঘটছে, সবই অধ্যয়ন আর পর্যবেক্ষণ দিয়ে খতিয়ে দেখা এবং সব ব্যাপারেই মুক্ত চিন্তার অভিমুখ ছড়িয়ে দেওয়ার অভ্যাস। ইত্তেফাকের বর্তমান সম্পাদক তাসমিমা  হোসেন এবং তার সহকর্মীরাও যে মঞ্জু সাহেবের যোগ্য, দক্ষ সহমর্মী তা বলতে আমাদের দ্বিধা নেই। ব্যক্তিপ্রতিভার উত্তরাধিকার এভাবেই স্থাপিত হয়। প্রশ্নহীন আনুগত্য বা বিশ্বাসের সংশয় দিয়ে তাকে সাজানো যায় না। সে সেজে ওঠে ঐতিহ্যের হাত ছুঁয়ে। ঘটনাপ্রবাহও তাকে সাজিয়ে তোলে। সে প্রশ্ন শুনতে চায়, জিজ্ঞাসাকে গুরুত্ব দেয় এবং পূর্বজের ভাবনাচিন্তাকে বেছে নিয়ে সে কর্মকারক হয়ে ওঠে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর (যাকে মঞ্জু ভাই বলতে স্বচ্ছন্দ করি) নির্মাণ ও স্বনির্মাণে আমরা এসব লক্ষণ লক্ষ করে আপ্লুতবোধ করি। এই বোধ যেমন সহজিয়া, তেমনি প্রশ্নমুখর।

প্রশ্ন আর প্রেম অবিচ্ছেদ্য, একে অন্যের পরিপূরক। প্রশ্নহীন প্রেমের ভবিষ্যত্ নেই। স্থায়িত্ব নেই। যে প্রেম ভেতরে আহ্বান জানায়, বাইরেও সে রুচি, যুক্তি নিয়ে ব্যক্তি অথবা বৃহতের পাশে দাঁড়ায়। এটাই খাঁটি প্রেম। নির্ণয় যার সুচিহ্নিত এবং গতি অনিঃশেষ। কর্মে আর মর্মে সম্পাদক মঞ্জু ভাই আর রাজনীতিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ব্যক্তিকতায় দূরত্বের চেয়ে নৈকট্যের, নৈকট্যবোধের জোর অনেক বেশি। এই জোর শতবর্ষের দিকে এগোচ্ছে। নিঃশব্দে। নিঃশব্দ চরণের বিচরণ মানেই তো সর্বদা জেগে থাকার সচেতন, সতর্ক আগ্রহ। মঞ্জু ভাইকে এরকম ভাবতে আর দেখতে ভালো লাগছে। তার জন্মদিনকে ঘিরে এভাবেই আমরা খুঁজে পাই আমাদের সামাজিকতার, আমাদের যুক্তিময় ভাবাবেগের মনোহর বিস্তার। এই বিমুক্ত, সম্মুখপ্রবণ আবহেই জেগে থাক, বেঁচে থাক তার প্রতি সবার বিনম্র মুগ্ধতা। খোলা থাক দরজা।

n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক,

 সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

mail id: [email protected]