বগুড়ায় মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শহরের চারমাথা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দুই পক্ষের হামলা-পালটা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কাউন্টার ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেখানে সাতটি মোটরসাইকেলও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পালটা হামলায় সাতটি বাস ও দুটি পেট্রোল পাম্প ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল রমজান আলীকে ছুরিকাঘাত এবং জেটিভির ক্যামেরা পারসনকে মারপিট ও ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এছাড়াও সংঘর্ষের ঘটনায় আরো পাঁচ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ অর্ধশত রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এদিকে এ হামলার ঘটনায় এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ও মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহনকে গ্রেফতারের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সর্বশেষ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। তিনি এ হামলার জন্য মঞ্জুরুল আলমকে দায়ী করেছেন।
জানা যায়, বগুড়া জেলা মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে গত তিন বছর ধরে বিরোধ চলে আসছে। এর মধ্যে এক পক্ষের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ও জেলা মোটর মালিক গ্রুপের সাবেক আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম মোহন। আরেক পক্ষে রয়েছেন বগুড়া পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সদর থানা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল ইসলাম।
জানা গেছে, তিন বছর আগে বগুড়া জেলা মোটর মালিক গ্রুপের একটি নির্বাচন হয়। ঐ নির্বাচনে আকতারুজ্জামান ডিউক সভাপতি ও আমিনুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন থেকেই এ ভোটকে অবৈধ দাবি করে আসছেন মঞ্জুরুল আলম মোহন। তার দাবি, কোনো আইনকানুন না মেনে নির্বাচন করা হয়। এরপর বিষয়টি আদালতে গড়ায়। মঞ্জুরুল আলম মোহনের দাবি, আদালতের রায় তাদের পক্ষে এসেছে এবং রায় বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্তি জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে প্রায় ২০০ মোটরসাইকেল নিয়ে মঞ্জুরুল আলম মোহনের নেতৃত্বে চার শতাধিক যুবক শহরের চারমাথা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে আসে। এ সময় আমিনুল ইসলামের অনুসারী ৪০-৪৫ জন কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিল। মোহন গ্রুপের লোকজন আগাতে থাকলে পুলিশ আমিনুল ইসলাম অনুসারীদের সরিয়ে দেয়। একপর্যায়ে মোহন গ্রুপের লোকজন আমিনুল ইসলামের মালিকাধীন শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কাউন্টার ও তার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলের কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় কার্যালয়ের সামনে থাকা সাতটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে রাজু নামে জেটিভির ক্যামেরা পারসন মারাত্মক আহত হন। একপর্যায়ে সাদা পোশাকে নিয়োজিত পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল রমজান আলীকে ছুরিকাঘাত করা হয়। বর্তমানে তিনি বগুড়ার শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে ইট পাটক্ষেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২৫ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা পালিয়ে গেলে আমিনুল ইসলাম গ্রুপের লোকজন মোহন গ্রুপের একটিসহ দুটি পাম্প ভাঙচুর করে।
এ ঘটনায় আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মঞ্জুরুল আলমের নেতৃত্বে দুই শতাধিক মোটরসাইকেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে তার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। মোটর মালিক গ্রুপের কার্যালয় দখল করতেই এই হামলা চালানো হয়। অবিলম্বে মঞ্জুরুল আলমসহ হামলাকারীদের গ্রেফতার করা না হলে বগুড়া থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেন তিনি। পরে শ্রমিকদের নিয়ে একটি লাঠি মিছিল বের করেন চারমাথা এলাকায়।
অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন বলেন, বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছেন কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করায় এক জন মালিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এক জন পরিবহন মালিক হিসেবে তিনি আজ মোটর মালিক গ্রুপের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আমিনুল ইসলাম ও তার লোকজন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছেন।
বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি জানান, হামলায় ডিএসবির এক সদস্য ছুরিকাহাত হন। সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ আট জনকে গ্রেফতার করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই মামলা করেনি।
