আট জঙ্গির ফাঁসি

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৪৫

জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যার মামলায় সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত (বরখাস্ত) মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জঙ্গির ফাঁসির রায় দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন :মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির, আবদুস সবুর ওরফে আবদুস সামাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল রিফাত, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব সাজিদ, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ও আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব। দণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম পলাতক রয়েছেন। কারাগারে থাকা সব আসামিই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। রায় উপলক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ছয় আসামিকে আদালতে আনা হয়। এরপর তাদের কোর্ট হাজতে রাখা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার একটু আগে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

বাংলাদেশে লেখক-প্রকাশক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর ধারাবাহিক জঙ্গি হামলার মধ্যে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কার্যালয়ে আক্রান্ত হন দীপন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে দীপনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ :৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মা. মজিবুর রহমান বলেন, লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের হত্যার অংশ হিসেবে অভিজিত রায়ের বই প্রকাশের জন্য জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। এ মামলার আসামিরা সবাই নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য। দীপনকে হত্যার জন্য আসামি সৈয়দ জিয়াউল হক নির্দেশ, প্রশিক্ষণ এবং মূল হত্যাকারীদের অর্থায়ন করে। আর অপর আসামি আকরাম হোসেনের পরিকল্পনায় আসামি মইনুল হাসান শামীম অস্ত্র সংগ্রহ, খুনের পরামর্শ এবং মূল হত্যাকারীদের দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেয়।

আরেক আসামি মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন হত্যা পরিকল্পনায় অংশগ্রহণসহ ঘটনাস্থল রেকি করায় এবং আসামি আবদুস সবুর হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়। আর আবু সিদ্দিক সোহেল ও খাইরুল ইসলাম ঘটনাস্থল রেকি করে এবং আরেক আসামি শেখ আব্দুল্লাহ টাকা হস্তান্তর করে। তারা দীপন হত্যাকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের অভিন্ন অভিপ্রায় ছিল ব্লগার, প্রকাশক ও সমকামীদের হত্যার অংশ হিসেবে ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা।

বিচারক আরো বলেন, যেহেতু আসামিরা আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসেবে সাংগঠনিকভাবে দীপন হত্যায় অংশগ্রহণ করেছে, সেজন্য তাদের একই সাজা হওয়া বাঞ্ছনীয়। আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যায় অংশগ্রহণকারীরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উত্সাহী হবে।

রায় শুনে কাঁদলেন দীপনের স্ত্রী

প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর অপেক্ষার পর স্বামী হত্যার বিচার পেয়ে আদালতে কাঁদলেন ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান। রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষের ভেতরে প্রায় ১০ মিনিট নীরবে বসে তাকে কাঁদতে দেখা যায়। পরে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি খুব অসুস্থ, কালকে আমার মামা মারা গেছেন। আমরা এই রায় নিয়ে সন্তুষ্ট। আজকে আমরা যে রায় পেয়েছি, এটার জন্য সংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

আইনজীবীরা যা বললেন

আসামিপক্ষের আইনজীবী খাইরুল ইসলাম লিটন ও এম নজরুল ইসলাম এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। খাইরুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘এই রায় সঠিক হয়নি। এ রায় একতরফা। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।’ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। আমরা আপিল করব।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনা করেন গোলাম ছারোয়ার খান জাকির। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, এ মামলার আসামিদের লক্ষ্য ছিল ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের হত্যা করে মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া এবং মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা। আর এই সবকিছুর উদ্দেশ্য হলো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করে দেওয়া। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধ্বংস করে দেওয়া।

যেভাবে হত্যা

দীপনকে যে বছর হত্যা করা হয়েছিল, সেই ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা চলার সময় টিএসসিতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় লেখক-ব্লগার অভিজিত্ রায়কে। এরপর কয়েক মাসের ব্যবধানে নিলাদ্রী চট্টোপাধ্যায় নিলয়সহ কয়েক জন ব্লগার-লেখককে হত্যা করা হয়। এরপর ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে দীপনকে হত্যার দিন একই সময়ে লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে এর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিন জনকে একই কায়দায় কোপানো হয়েছিল। তবে টুটুলসহ তিন জন বেঁচে যান। সেদিন বিকালে দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি দক্ষিণের সহকারী পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমান। চার্জশিটে আট জনকে অভিযুক্ত ও ১১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

কে এই জিয়া?

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এক সংবাদ সম্মেলনে সরকার উত্খাতে ধর্মান্ধ কয়েক জন সেনা কর্মকর্তার একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনা নস্যাত্ করার খবর দেয়। অভ্যুত্থানচেষ্টাকারীদের নেতা হিসেবে জানানো হয় মেজর জিয়ার নাম। তখন সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া জিয়া পালিয়ে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামে যুক্ত হন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিজিত্ হত্যা মামলাসহ আরো বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।