প্রহর শব্দ থেকে প্রহরী শব্দটি এসেছে। প্রাচীন বাংলায় জাগানিয়া (সদা সতর্ককারী), প্রহরী (৩ ঘণ্টায় এক প্রহর), অষ্ট প্রহরী (২৪ ঘণ্টা পাহারারত) ইত্যাদি নামে গ্রাম পুলিশের অস্তিত্ব ছিল। মোগল আমলে তারা পাশবন, নিঘাবন ও চৌকিদার নামে পরিচিত ছিল। তারা গ্রাম এলাকা পাহারাসহ রাস্তাঘাটও পাহারা দিত। স্থানীয় শাসনের সুবিধার্থে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন নামে বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিট সৃষ্টি করে; যেমন, পঞ্চায়েত, ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা, জেলা, পৌরসভা ইত্যাদি। কিন্তু স্থানীয় শাসন শুরু হয় পাড়া/মহল্লার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে। ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে তত্কালীন ভারতবর্ষে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা (পাঁচ জনের শাসন) প্রচলিত ছিল। তখন গ্রামগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। রাজা/সম্রাট/সুলতানের কার্যালয় (সরকার) ছিল খুবই দূরবর্তী প্রতিষ্ঠান। সেজন্য গ্রামের লোকেরা নিজস্ব অর্থায়নে পাহারাদার নিযুক্ত করত। চৌকি থেকে ‘চৌকিদার’ শব্দটি এসেছে। ব্রিটিশ সরকার গ্রাম চৌকিদারি আইন, ১৮৭০ প্রণয়নের মাধ্যমে তাদেরকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। তাদের কোমর বন্ধনী ও টুপিতে ব্রিটিশ রাজের মনোগ্রাম থাকায় সকলে তাদেরকে সমীহ ও মান্য করত (মোর দাদা চহিদার, ‘মুই আইনের মানুষ’ বাক্যটি ব্যাঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে দেখার কোনো সুযোগ নেই)। এরপর পাকিস্তান আমলে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ ১৯৫৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে দফাদার ও মহল্লাদার রাখা হয়। তখন তাদের বেতন ছিল ৫০ টাকা; যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সমান। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর মাধ্যমে তাদের নাম গ্রাম পুলিশ রাখা হয় এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বিষয়ক কার্যাবলী নির্দিষ্ট করা হয়। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী বিধিমালা, ২০১১ জারির মাধ্যমে তাদের চাকরির শর্ত ও পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে গ্রাম পুলিশদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও শর্তাবলি স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) গ্রাম পুলিশ বাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলি সম্পর্কিত বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে একজন দফাদার ৭ হাজার ও একজন মহল্লাদার ৬ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পান (যার অর্ধেক ইউনিয়ন পরিষদ ও বাকি অর্ধেক সরকার বহন করে)। তবে আশার কথা, মহামান্য হাইকোর্ট গত বছর ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত শুনানি শেষে প্রায় ৪০ হাজার গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা রাজস্ব খাত থেকে ২০তম ও ১৯তম গ্রেডে দেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেন। বিভিন্ন সরকার তাদের নাম গ্রাম পুলিশ রেখেই খালাস দেন। পূর্বে তাদের যতটুকু সম্মান ও মর্যাদা ছিল বর্তমানে সেটাও নেই। চেয়ারম্যান, মেম্বর, সেক্রেটারি, থানা পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের হুকুম তামিল করতে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ইউনিয়নে চেয়ারম্যান-মেম্বররা তাদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজকর্ম করিয়ে থাকে। কোনো কোনো জায়গায় চেয়ারম্যান-মেম্বর দ্বারা তাদেরকে অপদস্থ হতে দেখা যায়। সে সঙ্গে থানা পুলিশের ধমক-ধামক তো রয়েছেই। বলা যায়, সামন্ত অবশেষের অসুস্থ ঐতিহ্যের প্রত্যক্ষ শিকার তারা। প্রতি সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে তাদেরকে থানায় হাজিরা দিতে হয়। থানা পুলিশের কাছে গ্রামের অচেনা মানুষ দুর্বৃত্তসহ আসামিদের খবর তাদের দিতে হয়। ফলে দুর্বৃত্তরা তাদেরকে শত্রু হিসেবে দেখে থাকে। চোর-ডাকাত ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কর্মী দ্বারা গ্রাম পুলিশ খুন হওয়ার বহু ঘটনা রয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ছাড়াও গ্রাম আদালতের নোটিশ জারি, জমি জরিপ কাজ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, স্যানিটেশন কার্যক্রম, পরিবেশ রক্ষা, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক নিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধসহ প্রায় ৭০ প্রকারের দায়িত্ব দেওয়া আছে (সূত্র :গ্রাম পুলিশের প্রশিক্ষণ হ্যান্ডবুক)। উল্লেখ্য, যেসব ইউনিয়ন পরিষদ পৌরসভায় রূপান্তরিত হচ্ছে, সেসব পৌরসভায় গ্রাম পুলিশের চাকরি থাকছে না। অন্যদিকে ২০৫০ সালের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশই পৌরসভায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন গ্রাম পুলিশের চাকরির কি হবে! যদিও উন্নত বিশ্বে ‘নগর পুলিশ’ নামে আলাদা বাহিনী রয়েছে। এক্ষেত্রে দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা তথা-স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থাই সমাধান দিতে পারে। ইউনিয়ন সরকারে গ্রাম পুলিশরা ‘ইউনিয়ন পুলিশ’ এবং নগরে তারা ‘নগর পুলিশ’ নামে কর্মরত থাকবে। গ্রাম পুলিশরা ইউনিয়ন কেন্দ্রিক অপরাধীদের ধরে গ্রাম আদালতে এবং মামলার ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের আদালতে সোপর্দ করবে। তাদের বেতন-ভাতা স্থানীয় সরকার বহন করবে। এদেশে দীর্ঘদিন এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকায় মানুষের ধারণা কেন্দ্রীয় সরকারই হলো একমাত্র সরকার, স্থানীয় সরকার কোনো সরকার নয়। কিন্তু স্থানীয় সরকারের পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ একই পদমর্যাদার হয় এবং তাদের অস্ত্রও যে একই হয়, সেটা উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
n লেখক :গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয়
সরকার বিষয়ক গবেষক
