ভাষা আন্দোলনে কিশোর শহিদ

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:৫৪

হাজার হাজার বছরের বাংলা। বাংলা ভাষা। এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে এ ভাষায়। কবিতা-গানে ভরপুর এ দেশ। এ দেশেই জন্মেছেন প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগের কবি-সাহিত্যিকবৃন্দ? লালন-হাছন; মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ দাশের কবিতা গান, এ দেশের প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত।

১৭৫৭ সালে এ দেশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে চলে যায়। তারপর ব্রিটিশ শাসন। প্রায় দুশো বছরের বেড়াজাল ছিন্ন হয় ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান হাজার মাইল ব্যবধানে একমাত্র প্রদেশ। এর ভাষা-সংস্কৃতি একেবারেই পশ্চিম থেকে আলাদা। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়া এ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক খুবই অল্প।

তাই পাকিস্তানের জনক ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ খুবই সহজে বলতে পারেন—‘পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হবে কেবলই উর্দু।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি, ছাত্রদেরও স্বাভাবিক উত্তর ছিল—‘না’। কেবল ‘না’ বলেই তারা থামেনি। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৮৫১, এই চার বছর ১১ মার্চ তারা পালন করে ‘রাষ্ট্রভাষা’ দিবস। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন পুনর্বার রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে ঘোষণা দিলে পূর্ববাংলায় আগুন জ্বলে ওঠে। তারপর থেকে শুরু হয় বাঙালির প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। ৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালন করে তাদের সামর্থ্যের কথা পশ্চিম -পাকিস্তানিদের জানান দেয়। তারা ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটেরও ডাক দেয়। অন্যদিকে মুসলিম লীগ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সকল সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।

ছাত্রসমাজ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ সকাল থেকে মিছিলের পর মিছিল আসতে থাকে। কড়া পুলিশি প্রহরা মোকাবেলা করে ১৪৪ ধারা ভাঙতে উদ্যত হয় তারা। ছাত্রীরাও এতে সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে।

ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে হোটেলের বয়-বেয়ারা; পথচারী, রিকশাওয়ালা পর্যন্ত এতে অংশ নেয়।

শাসকচক্র রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেদিন ঘাঁটি স্থাপন করে। কাঁটাতার, স্টেনগানের ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্ররা পরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। বর্তমান জগন্নাথ হল ছিল তখন পরিষদ ভবন। ভবনের দিকে যেতেই পুলিশ গুলি চালায়। ফলে ৪ জন নিহত ১৭ জন আহত হয়। ভাষার জন্য দেশের জন্য প্রথম রক্তপাত। এর মাঝে তোমাদের মতো ছোট বয়সী ১১ বছরের কিশোর, আরেকজন ছিল নাম না জানা কিশোর, পরে জানা যায় তার নাম ছিল অলিউল্লাহ। আর নাম জানা কিশোরের নাম ছিল আখতারুজ্জামান। সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বারের পাশে ওদের নাম আজও কেন স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় না এ বড়ো বিস্ময়! এ বিস্ময় আরো বেশি প্রকাশিত হয় যখন ড. রফিকুল ইসলামের কথা শুনি।

তিনি বলেন—‘২১ শে ফেব্রুয়ারিতে যেমন ভাষার দাবীতে কিশোররা আহত ও নিহত হয়, ২২ শে ফেব্রুয়ারিতেও তেমনি শিশুর মাথায় বন্দুকের সঙ্গীন দ্বারা আঘাত করা হয়।’

বোঝাই যাচ্ছে ভাষা শহিদদের ইতিহাসে বড়োদের সাথে, তরুণ সমাজের সাথে কিশোর সমাজও এগিয়েছিল নির্ভীকতায়। নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলা মায়ের দামাল খোকারা রক্তে ভিজিয়েছিল পকেটে রাখা ‘মায়ের চিঠি’।

এসো, অমর একুশে ফেব্রুয়ারিতে তাদের স্মরণ করি অন্তরের শ্রদ্ধা দিয়ে, আমাদের সকল ভালোবাসা দিয়ে...।

 

অলংকরণ

মেররেতে তাশকিনা হোসেন চিশ্তী

অষ্টম শ্রেণি, বাঁচা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ঢাকা

ইত্তেফাক/এএএম