নগরে নিসর্গের কী প্রয়োজন?

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫৫

ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২ কোটি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০৩৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াইবে সাড়ে ৩ কোটিতে। মানুষ তো অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখা বদ্ধ মাছ নহে। সুস্থ-সুন্দর স্বাভাবিকভাবে বাঁচিতে খোলা পরিবেশ এবং পার্কের গুরুত্ব অপরিসীম। এই জন্য গত অক্টোবরের বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস এবং শিশু অধিকার সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানাইয়া বলিয়াছেন যে, করোনা ভাইরাসে শিশুরা স্কুলে যাইতে পারিতেছে না, সেই জন্য অভিভাবকরা যেন তাহাদের সন্তানদের নিকটবর্তী কোনো পার্কে লইয়া যান। পার্কে দিনে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হইলেও ছোটাছুটি বা খেলাধুলা শিশুরা করিতে পারে, সেই সুযোগটা সৃষ্টি করিবার কথা বলিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ, তিনি উপলব্ধি করিতে পারিয়াছেন যে শিশুদের স্বাস্থ্য এবং মানসিক অবস্থার জন্য সকল দিক হইতেই ইহার গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু কোথায় পার্ক? হ্যাঁ। বলা যাইতেই পারে, নগরবাসীর শরীরচর্চা ও বিনোদন আর শিশুদের খেলাধুলার জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রহিয়াছে ৫৪টি পার্ক ও ২৫টি খেলার মাঠ। যদিও এই সকল পার্ক-মাঠের মধ্যে এখন ১২টির কোনো অস্তিত্বই নাই। যেই কয়টি মাঠ ও পার্কের অস্তিত্ব রহিয়াছে, সেইগুলিও যথাযথ নজরদারি না থাকার কারণে একের পর এক বেদখল হইয়া যাইতেছে। বেদখল হইয়া যাওয়া এই সকল পার্কে ও মাঠে গড়িয়া উঠিতেছে বিভিন্ন দোকান, ক্লিনিক, আড়ত, রেন্ট-এ-কার স্ট্যান্ড, গাড়ির গ্যারেজ, মালামাল রাখিবার গুদাম, বাণিজ্যিক অবকাঠামো। এমনকি কোনো কোনো পার্ক ও মাঠ ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হইয়া গিয়াছে। তাহা হইলে কোটি টাকার প্রশ্ন হইল, শিশুদের কোন পার্কে লইয়া যাইবেন তাহার অভিভাবকরা? ঢাকার জনসংখ্যা যখন বর্তমানের চার ভাগের এক ভাগ ছিল, তখনো শতাধিক পার্ক কিংবা খোলা জায়গা ছিল। তাহাও ছিল অপর্যাপ্ত। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, একটি সুষ্ঠু সুন্দর নগরে স্থানীয় পার্ক সারা পৃথিবীতেই অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত গড়িয়া তোলা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন পার্কগুলির মধ্যে খুব বেশি হইলে ২০টি পার্ক বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য। অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হইল, সম্প্রতি পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে এক বত্সর আগেও যেইখানে একটি দৃষ্টিনন্দন পার্ক ছিল, সেই ‘নগরে নিসর্গ’ নামের পার্কটি ভাঙিয়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বর্তমানে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করিতেছে। অর্থাত্ সেইখানে স্বচ্ছ পানির তলদেশে মাছ ঘোরাফেরা করিবে না আর। ভাসিয়া বেড়াইবে না হাঁসের দল। টিলার মতো স্থাপনার উপর হইতে ঝরনাধারা আর গড়াইয়া পড়িবে না। স্থানীয় শিশুরা তাহাদের শৈশবটাকে আর রাঙাইতে পারিবে না। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জির মধ্যে আগে এইখানকার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে যেই সকল পাখপাখালি হাট বসাইত, তাহারাও আসিবে না আর।

প্রশ্ন করা যাইতেই পারে—কী দরকার নগরে নির্সগের? কী দরকার সবুজের সমারোহের, পাখপাখালির? পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে কর্তৃপক্ষ দাবি করিয়াছেন, পার্কটি নাকি বেদখল হইবার উপক্রম হইয়াছিল! সেই কারণেই উহাকে নাকি ভাগাড়ে পরিণত করিয়া দখল হইতে রক্ষা করা হইল! কী চমত্কার সমাধান! আমরা ইতিমধ্যেই ঢাকার উভয় সিটি করপোরেশন মেয়রদ্বয়ের কাজের আন্তরিকতা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পাইয়াছি। তবে কেবল প্রতিশ্রুতি ও সুন্দর কথাই কিন্তু ভাবমূর্তি জাগরূক রাখিবার জন্য যথেষ্ট নহে। কথার সহিত কাজের মিল না থাকিলে নগরে নিসর্গের মতো সুন্দর ভাবমূর্তিও প্রহসনে তথা ভাগাড়ে পরিণত হইতে পারে। আমরা আশা করিব, সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মনিষ্ঠ মেয়র ‘নগরে নিসর্গ’কে ভাগাড় বানাইবার সিদ্ধান্ত হইতে সরিয়া আসিবেন এবং উহাকে আরো নান্দনিকভাবে সাজাইয়া তুলিবেন।