সুন্দরবনকে ভালোবাসুন

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৫৭

সতীর্থ রহমান

আগামীকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’—এ খবর আমরা অনেকেই জানি না। সুন্দরবন ভালোবাসেন এমন ব্যক্তিদের উদ্যোগে ২০০১ সাল থেকে বেসরকারিভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে।

সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পদও বটে। বিশ্ব ঐতিহ্য। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশীদার হতে পারায় আমরা গর্ববোধ করি। বিরাট এলাকা জুড়ে এই সুন্দরবন। এর আয়তন প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার তিনদিন আগে ও পরে জোয়ারভাটার পানি আসে। স্থানীয় ভাষায় একে বলে ‘জুগার পানি’। আমাদের ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি রক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীর একক বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনের গুরুত্ব অপরিসীম। ম্যানগ্রোভ হলো একটি বিশেষ ধরনের বন। এ বন সৃষ্টি হয় নোনা ও মিঠা পানির মিলিত প্রবাহের এলাকায়। তবে সে পানির মাত্রা একটি নির্দিষ্ট সীমায় থাকলেই এমন বন গড়ে উঠতে পারে। সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদে ভরপুর। এ বনের গহিন নির্জনে চোখে পড়ে সুন্দরী ও গোলপাতা গাছের সারি। এছাড়াও রয়েছে গেওয়া, কেওড়া, বাইন, পশুর, গরান,আমুড় ইত্যাদি গাছ।

সুন্দরবনের মধু বিখ্যাত। যারা মধু সংগ্রহ করে তাদের বলা হয় মৌয়াল বা মৌয়ালি। বসন্ত ও গ্রীষ্ম কালে এরা দলবদ্ধ হয়ে নৌকায় করে জঙ্গলে যায়, মৌচাক ভেঙে মধু সংগ্রহ করে। মধুর সন্ধান এক মজার ব্যাপার। মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু আহরণ করে কোন দিকে উড়ে যায়, মৌয়ালিরা তা ভালো করে লক্ষ করে। এভাবে তারা মৌচাকের খোঁজ পেয়ে যায়। মধুর নেশায় মৌমাছির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় মৌয়ালিদের বাঘের মুখে পড়তে হয়। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ ৪২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ছাড়াও রয়েছে নানারকম পাখি। জল ও জঙ্গল মিলে ১২০ প্রজাতির মাছ ও ৩৪ রকমের সরীসৃপ রয়েছে। সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে হাঙ্গর, কুমির ও সাপ খুবই হিংস্র। তবে এগুলো আমাদের সম্পদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এরা সহায়ক। এরা যাতে নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করতে পারে, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। শীতে অসংখ্য অতিথি পাখির সমাগম হয় সুন্দরবনে। বনের নির্দিষ্ট এলাকা বন্য পশুপাখির নিরাপদ স্থান, যাকে ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুন্দরবনে রয়েছে অফুরন্ত বনজ ও প্রাণীজ সম্পদ। হাজার হাজার মানুষ বাঁচে এ সম্পদের ওপর নির্ভর করে। সম্পদে ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ সুন্দরবন।

মানুষ যত বাড়ছে, চাহিদাও তত বাড়ছে। মানুষের অভাব ও কর্মসংস্থানের জন্য সুন্দরবন চুরি হচ্ছে। কিছু অসাধু বনকর্তা এবং স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল বন ধ্বংসের জন্য দায়ী। ভূমিদস্যু ও জলদস্যুরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কাঠচোর ও চোরাশিকারিদের তত্পরতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের ওপর অর্পিত। সুন্দরবন ধ্বংস হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। সুন্দরবনকে সুরক্ষার জন্য সত্ ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ প্রয়োজন। গণসচেতনতাই সুন্দরবন রক্ষা করবে। এজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সুন্দরবনের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়ুক। সুন্দরবনকে ভালোবাসুন। আমাদের ভালোবাসার বিষয় হোক সুন্দরবন—সুন্দরবন দিবসের প্রাক্কালে এই প্রত্যাশা।

দিনাজপুর