মেনহাজুল ইসলাম তারেক
আজ ১০ম বিশ্ব বেতার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য : ‘নতুন বিশ্ব, নতুন বেতার’। বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে একটি অনুসরণীয় মডেল দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব বেতার দিবস পালিত হয়ে আসছে। এতে অংশ নেয় বাংলাদেশ বেতার, প্রাইভেট এফএম এবং কমিউনিটি রেডিওগুলো। আগামীর বাংলাদেশ হবে রেডিওর বাংলাদেশ। সরকার এর মধ্যে ২৮টি প্রাইভেট এফএম এবং ৩২টিরও বেশি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ বেতার ১২টি আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র এবং ৩৫টি এফএম পরিচালনা করছে। সারা দেশে পাঁচ হাজার ‘শ্রোতা ক্লাব’ গঠিত হয়েছে শ্রোতাদের উদ্যোগে। এ উপলক্ষ্যে প্রতিবছর আগারগাঁও জাতীয় বেতার ভবনে মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, করোনার কারনে এবার ছোট করে হলেও তা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বেতার একটি নাম, একটি ইতিহাস। এই ইতিহাস একদিনে রচিত হয়নি। যার শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে। সেই ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর এদেশে বেতারের প্রতিষ্ঠা। সেদিন যে বীজ উপ্ত হয়েছিল তাই আজ শাখা-প্রশাখা, পত্র-পল্লবে সুশোভিত এক বিশাল মহীরুহ। কালক্রমে এটাই আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন, সর্ববৃহত্ ও শক্তিশালী গণমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
দেশের অনেক স্থানে এখনো বিদ্যুত্ নেই, থাকলেও নিরবিচ্ছিন্ন নয়; অনেক স্থানে স্যাটেলাইট সংযোগও নেই। সেখানে জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য ও বিনোদনের চাহিদা পূরণের একমাত্র নির্ভরশীল মাধ্যম হচ্ছে বাংলাদেশ বেতার। বাংলাদেশ বেতারই একমাত্র ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, যা দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এই দেশে প্রায়ই উপকূলবর্তী এলাকাগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকে; তখনো সেসব এলাকায় তথ্য, আবহাওয়া কিংবা মুহূর্তের সংবাদ পৌঁছে দিয়ে থাকে বেতার। তার কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, সংসদ, খেলাধুলা, সাক্ষাত্কার, জনসচেতনতা সৃষ্টি, সরকারি নীতি, কার্যক্রম, উন্নয়ন জনগণকে অবহিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করে বাংলাদেশ বেতার তার শেকড় সন্ধানী মনোভাব নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান শ্রোতাদের প্রতিনিয়তই উপহার দিচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীর আকাশছোঁয়া প্রযুক্তির বিস্তারের পরও বেতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। অনেকেরই ধারণা ইন্টারনেটের অগ্রযাত্রার এই সময়ে রেডিও তার গুরুত্ব হারিয়েছে। ধারণাটি মোটেই ঠিক বলে মনে হয় না আমার কাছে; কারণ সময় যেমন বদলেছে, ঠিক তেমনই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রচারণার ধরনও বদলে গেছে; এফএম রেডিও, অনলাইন রেডিও এবং অ্যাপসের মাধ্যমেও এখন বেতারের অনুষ্ঠান শোনা যায়। এখনো মানুষ রেডিও শোনে, রেডিওর ওপর নির্ভর করে অনেক মানুষ। সারা বিশ্বে বেতার এখনো অন্যতম জনপ্রিয় গণমাধ্যম। বেতারের রয়েছে পৃথিবীর দুর্গম স্থানে পৌঁছানোর অসীম শক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের ফলে সম্প্রচার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিযোগিতাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। গ্রামগঞ্জ ও দুর্গম এলাকায় এখনো বেতার তথ্য আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত। তাই বলা চলে ‘বেতার সবার জন্য, সবসময়, সবখানে’। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে গণমানুষের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে বেতার আরো সামনে এগিয়ে যাবে—এ প্রত্যাশাই করছি।
দিনাজপুর
