রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধান ও সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টায় পোশাক খাতের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হইয়াছে। এই খাতে কমিয়া আসিয়াছে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের সংখ্যা; কিন্তু নির্মাণ খাতে আশানুরূপ সাফল্য এখনো অধরা। এই খাতে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় দুর্ঘটনা হইতে শুধু শ্রমিকরাই নহে, পথচারীরাও রক্ষা পাইতেছেন না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) তথ্যমতে, গত ছয় বত্সরে রাজধানীতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৬২০ জন শ্রমিক নিহত ও ৫৭৮ জন শ্রমিক আহত হইয়াছেন। গেল বত্সর তথা ২০২০ সালে এক বত্সরে সারা দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছেন ৭২৯ জন শ্রমিক। তাহাদের মধ্যে রহিয়াছেন নির্মাণশ্রমিকরাও। শুধু দেশেই নহে, বিদেশেও কাজ করিতে গিয়া উল্লেখযোগ্য অভিবাসী শ্রমিক নানা দুর্ঘটনায় হতাহত হইতেছেন। এই হতাহতের ঘটনা নির্মাণ খাতেই অধিক। এই খাতের শ্রমিকরা কেন বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হইতেছেন, তাহা গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা দরকার।
রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ লক্ষ নির্মাণশ্রমিক কাজ করিয়া থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহুতল ভবনে তাহারা কাজ করেন অরক্ষিত অবস্থায়। দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণও করেন অনেকে। সম্প্রতি রাজধানীতে বহুতল ভবনে একজন মাচা তৈরি করিতে গিয়া ও অন্যজন মাচা ভাঙিয়া পড়িয়া নিহত হইয়াছেন। এখনো বিভিন্ন ভবন তৈরিতে ব্যবহূত হইতেছে বাঁশের মাচা যাহা ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের মধ্যে রহিয়াছে—ভালো সিঁড়ির অভাব, সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলো না থাকা, এলোমেলোভাবে রড, বালু ও ইট রাখা, নাজুক নেটের ব্যবহার বা নেট না থাকা, কপিকলের ব্যবস্থা না থাকা, শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, গ্লাভস ও বুটের ব্যবস্থা না করা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের কারণে দেওয়াল বা মাটিচাপা পড়া, ঝুলন্ত অবস্থায় কাজ করিবার সময় ঠিকমতো বেল্ট ব্যবহার না করা, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন ইত্যাদি। দুর্ঘটনার প্রকৃতির মধ্যে রহিয়াছে উপর হইতে পড়িয়া যাওয়া, মাথায় আঘাত পাওয়া, হাত বা পা ভাঙিয়া বা কাটিয়া যাওয়া, চোখে আঘাত লাগা, অগ্নিকাণ্ড বা আবদ্ধ গ্যাসের শিকার হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার বা সুইচের সংস্পর্শে আসা প্রভৃতি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট আইন রহিয়াছে; কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ তেমন নাই বলিলেই চলে। নির্মাণ খাতের কিছু কিছু বৃহত্ ফার্ম বা কোম্পানি নিয়মকানুন ও নীতিমালা মানিয়া চলে; কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এই ব্যাপারে উদাসীন। আবার শ্রমিকদের অধিকাংশই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। তাহাদের মধ্যে সচেতনতার অভাবও বিদ্যমান। অসতর্ক ও অসাবধানতার কারণেও তাহারা প্রায়শ দুর্ঘটনার কবলে নিপতিত হন।
কর্মক্ষেত্রে নির্মাণশ্রমিকরা যাহাতে দুর্ঘটনার শিকার না হন, এই জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ব্রিটিশ আমলে হারিকেনের সহিত লাল কাগজ ঝুলাইয়া দেওয়া হইত মানুষকে সতর্ক করিয়া দেওয়ার জন্য। রাত্রিতে তো বটেই, দিনের বেলায়ও যে কোনো নির্মাণকাজ করিতে হইলে শ্রমিক ও পথচারীদের সতর্কতায় পর্যাপ্ত সাইন-সিম্বলের ব্যবস্থা করা উচিত। এই শিল্পে সেফটি নেট ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। আইন মানিয়া ভবন নির্মাণ করা হইতেছে কি না—তাহা দেখিবার জন্য কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের পরিদর্শকগণ রহিয়াছেন। তাহাদের জনবল যেমন বাড়াইতে হইবে, তেমনি তাহাদের কাজে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করিতে হইবে। বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হইতেছে কি না—তাহা দেখিতে হইবে। শ্রমিকদের কর্মের ধরন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম তথা হেলমেট, গ্লাভস, বুট, অ্যাপ্রোন, বিশেষ চশমা ইত্যাদির ব্যবহার সুনিশ্চিত করিতে হইবে। মালিক ও শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও হইতে হইবে সচেতন ও দায়িত্বশীল।
