আস্থাসংকটে পঞ্চমবর্ষে কে এম হুদা কমিশন

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৩৮

বহুল আলোচিত কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের চার বছর পূর্তি আজ। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বর্তমান কমিশন শপথ গ্রহণ করে। দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে যাত্রা শুরু করা বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচন ইস্যুতে একপক্ষের কাছে আস্থা এবং অন্য পক্ষের কাছে আস্থাহীনতার মধ্যে দিয়ে পার করেছে। জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় নির্বাচনে স্বল্প ভোটার উপস্থিতি, অনিয়ম, ইভিএম বিতর্ক, ইসির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রোডম্যাপ অনুসরণ না করা, প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত দুর্নীতি, প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত আরপিও থেকে ৯১ (ই) ধারাসহ মৌলিক ১০টি ধারা বাতিলের প্রস্তাব, রাষ্ট্রপতির      বরাবর ৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবিসহ ভোটে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা নিয়ে এক ধরনের আস্থা ও ভাবমূর্তির সংকটে রয়েছে বর্তমান ইসি। যদিও বর্তমান কমিশনের মতো বিগত নির্বাচন কমিশনগুলোর বিরুদ্ধেও আস্থার সংকট ছিল। কোনো কোনো কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও ওঠে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজের মন্তব্য, বর্তমান ইসির অধীনে অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি নির্বাচনেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনেক, কিন্তু কার্যক্রম সেই ভাবে চোখে পড়েনি। সামনের এক বছরে আরো বেশকিছু নির্বাচন রয়েছে। এগুলো ভালোভাবে শেষ করতে পারলে হয়ত তাদের বিদায়টা কিছুটা ভালো হতে পারে।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিযোগ, ভোট ব্যবস্থাপনায় ইসির ব্যর্থতা ও অদক্ষতার কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ভোটাররা। আবার ইভিএম নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করে ইসি। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই একাদশ সংসদ নির্বাচনের কাজের তালিকা বা রোডম্যাপ প্রকাশ করে। ভোটের আগে সংসদ নির্বাচনের অন্যতম পাঁচটি অনুষঙ্গকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০১৮ সালের আগস্টের মধ্যে সে সব কাজ শেষ করার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। রোডম্যাপে যে সাতটি কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছিল তার বেশির ভাগ যথাযথ কার্যকর হয়নি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগেই আইন পরিবর্তন, বিতর্কিত সীমানা পরিবর্তন, হাইকোর্টের আদেশে একের পর এক নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পরও কার্যকর কোনো ভূমিকা না নেওয়া, ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করতে না পারা, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের কারণে সীমানা পুনর্নির্ধারণ থেকে পিছু হটার অভিযোগ ওঠে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পায় আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি। তারা নতুন করে নির্বাচনেরও দাবিও করে। আর এ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই চলতি বছরের জানুয়ারির শেষে নির্বাচন নিয়েই শুরুতেই প্রশ্ন তোলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ পর্বের ভোটগ্রহণ শেষে ইসির তত্পরতা নিয়ে ফের প্রশ্ন তোলেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর নির্বাচন প্রক্রিয়া সংস্কার চেয়ে মাহবুব তালুকদার বরিশাল, গাজীপুর ও খুলনা সিটির ভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সিটি করপোরেশন ও উপনির্বাচনগুলোয় ভোটার কম উপস্থিতি, অনিয়মের অভিযোগ তো আছেই।

কমিশনারদের মতপার্থক্য : সিইসি ও কমিশনারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন সময়। বরাবরই বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার মাহবুব তালুকদার। এক্ষেত্রে সিইসিসহ বাকি চার জন একপক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সমালোচনায় কারো সমর্থন না পেলেও নির্বাচন কমিশনে কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা ও সিনিয়র সচিব মো. আলমগীরের বিরুদ্ধে একাট্টা হন চার কমিশনার। চার কমিশনারের কোনো মতামত না নিয়েই ৩৩৯ জন কর্মচারীর নিয়োগ চূড়ান্ত করায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর সচিব ও কমিশনারদের পালটাপালটি বক্তব্যজনতি সৃষ্ট দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।

অনিয়মের অভিযোগ : দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে ঘরে বাইরে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ তোলেন। তবে কঠোরভাবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। গত ১৪ ডিসেম্বর বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় ১৭ জানুয়ারি পুনরায় রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেন এই নাগরিকরা। এতে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে ইসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তারা।

পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক : গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে ফের বিতর্কের মুখে পড়ে কে এম নূরুল হুদা কমিশন। এবারের পৌর নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

আজ মাহবুবের সংবাদ সম্মেলন: বিগত চার বছরে নির্বাচন কমিশনের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে আজ সোমবার সাংবাদিকদের কাছে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করবেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তার বক্তব্যে কমিশনের চার বছরের কার্যক্রম থাকছে বলে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কমিশনের দিক থেকে তারা সর্বাত্মক আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা চালিয়েছেন। নির্বাচনে যখনই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভোট শেষ হওয়ার পরে ইসির হাতে আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। এরপর সংক্ষুব্ধরা আদালতের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা তা না করে ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দায়িত্ব শেষ করেছেন।