কথায় আছে, আপনি বন্ধু পরিবর্তন করিতে পারিবেন কিন্তু প্রতিবেশী বদলাইতে পারিবেন না। অর্থাত্ প্রতিটি প্রতিবেশী পরস্পর পরস্পরের সহিত গভীরভাবে জড়িত। প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগিলে তাহার উত্তাপ আপনাকেও ছুঁইতে পারে। প্রতিবেশীর ছাদে এডিস মশার লার্ভা জমিয়া থাকিলে সেই মশা আসিয়া আপনার শরীরে হুল ফুটাইয়া ডেঙ্গুর ভাইরাস ঢুকাইয়া দিয়া যাইতে পারে। তেমনিভাবে কেহ যদি প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে ময়লা ছুড়িয়া মারে, তাহা হইবে আকাশের দিকে থুতু ছুড়িয়া মারিবার মতো। অর্থাত্ প্রতিবেশীর প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন না হইলে ইহার বিপদ উভয়েরই। কিন্তু আমরা এই ব্যাপারে কতখানি সচেতন?
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির একটি। এইখানে নগরাঞ্চলে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে অসংখ্য বাড়িঘর। রবীন্দ্রনাথের কথায় প্রতিধ্বনি তুলিয়া বলা যায়, ‘আমরা বহু শত বত্সর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখদুঃখে মানুষ, তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন-একটি পাপ আমরা ঘোষণা করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এই পাপকে ঈশ্বর কোনোমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না।’ অথচ মানুষে মানুষে ভালো থাকিবার অর্থ হইতেছে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ। এই ক্ষেত্রে অনেক মনীষী বলেন যে, জননী যেমন সন্তানের জন্য স্নেহ-ভালোবাসা পোষণ করেন, সেইভাবে একজন মানুষকে আরেক জনের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা পোষণ করিতে হইবে। কিন্তু সমাজে আমরা তাহার বিপরীত দৃশ্যটিই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখি। কিছু ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই রহিয়াছে। কিন্তু ব্যতিক্রম তো উদাহরণ হইতে পারে না। বলা হয় যে, আমাদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা ভর করিয়াছে প্রবলভাবে। অন্যদিকে ইহাও বলা হয় যে, ন্যূনতম যথাযথ শিক্ষার অভাবে স্বার্থের যূপকাষ্ঠে আমরা আমাদের মানবিক গুণাবলিকে বলি দিয়াছি। আমরা কী করিয়া ভুলিয়া যাই, যেইখানে ধর্মেও বলা আছে—নিজের কল্যাণের পাশাপাশি যদি অর্জিত সম্পদ অভাবীদের জন্য ব্যয় না করি, তাহা হইলে পরকালে তাহার হিসাব দিতে হইবে বটে! নিজের পরিবার, প্রতিবেশী এবং প্রকৃতির সহিত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কে আবদ্ধ হইয়া স্বার্থপরতা ত্যাগের মাধ্যমেই একটি সুন্দর পৃথিবী গড়িয়া উঠিতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমরা ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ গ্রন্থ হইতে বলিতে পারি—আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না; ভূরিপরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না, আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস, এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।
সুতরাং এই যদি হয় আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য, তাহা হইলে আমাদের মধ্যকার হিংসা-দ্বেষ দূর করিবে কে? ইহা কেবল দূর করিতে পারে প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক উন্নতি। আমাদের সকলের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হইতে হইবে, শিক্ষাযোগ্যতা বাড়াইতে হইবে। তাহা হইলে একটি সময় আসিয়া এই সকল সমস্যা দূরীভূত হইবে নিশ্চয়ই। অর্থ ও শিক্ষার আলো সকল দৈন্য দূর করিয়া দেয়।
