সমাজ আজ কোন পথে?

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:০১

কয়েক দিন আগে ইউল্যাবের শিক্ষার্থীর একটি নির্মম ঘটনা ঘটেছে। এই মেয়েটির জন্ম, বেড়ে ওঠা আমার চোখের সামনে। ওর মা-বাবাসহ পুরো পরিবারকে আমি চিনি। আমাদের পাড়াতেই বেড়ে ওঠা ওর। একটি শিক্ষিত, ভদ্র ও সচেতন পরিবার বলতে যা বোঝায় সবটাই এই মেয়েটির পরিবার ধারণ করে। তাহলে কেন ওর বেলায় এটা ঘটল? পরিবারের কি ভুল ছিল? পরিবার খেয়াল করতে পারেনি হয়তো ডিজিটাল যুগে এতটা স্মার্ট আর আধুনিক হয়ে গিয়েছে, ভেতরে ভেতরে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে।

সেই মেয়েটিও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে যায়। উত্তরার বেম্বো শুট নামে সে রেস্টুরেন্টে বাংলা মদ নিয়ে এসে তারা খায় এবং এনজয় করে। তারপর মেয়েটিকে কোনো বন্ধুর বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুটা সময় একান্তে কাটানোর পর মেয়েটি অসুস্থ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে বমি করতে থাকে এবং অচেতন হয়ে যায়। রাতেই বন্ধুরা হসপিটালে নিয়ে যায়। বিভিন্ন হসপিটাল ঘুরে ভোর সাড়ে ৭টায় আনোয়ার খান মডার্ণ হসপিটালে ভর্তি করানো হয়। ততক্ষণে মেয়েটি ক্লিনিক্যালি ডেড। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এবং চারপাশের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মদ পানের কারণেই মৃত্যু হয় মেয়েটির। মদে বিষক্রিয়া ছিল। তারপর একে একে সব বন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর আরো এক বন্ধু মারা যায়। এতেই প্রমাণিত হয় অতিরিক্ত মদ্যপানে তাদের মৃত্যু হয়। তরুণ সমাজ কেন আজ এভাবে নষ্ট হচ্ছে? তারা কি পরিবার থেকে নৈতিক মূল্যবোধ বা ধর্মীয় শিক্ষা পাচ্ছে না? উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো কি তাদের সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিচ্ছে না? এখানে পরিবারের দায় কতটুকু?

আমি বলব, পরিবারের দায় সবার আগে। কারণ একটি পরিবার থেকেই একটি শিশুর চারিত্রিক গঠন, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি হয়। তাই যারাই বিপথগামী হচ্ছে পরিবারকে তার দায় নিতেই হবে। ছেলেমেয়ে উভয়কেই সঠিক শিক্ষায় মানুষ করতে হবে।  ঢাকার এই যান্ত্রিক জীবনে নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত কমবেশি সব বাবা-মাই ব্যস্ত থাকেন জীবিকার তাগিদে। তাই তারা তাদের সন্তানদের সেভাবে সময় দিতে পারেন না। এটাও একটা প্রধান কারণ।

এটা তো গেলো পরিবারের দায়িত্ববোধের কথা, এখন আসল কথায় আসি, সামাজিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। মাদক নির্মূল করতে হবে যুব সমাজ থেকে। বিভিন্ন ক্লাব, হোটেল রেস্টুরেন্টে বৈধ-অবৈধ মদের বার বসে।   আজকাল অনেক কবি-লেখক কবিতা-গল্প লেখেন রগরগা, অশ্লীলতায় ভরপুর তাদের লেখা। তারা হচ্ছেন আধুনিক কবি-সাহিত্যিক। আমি সবাইকে বলছি না, গুটি কয়েক। গত কয়েক দিন একটি গ্রুপে ধারাবাহিক গল্প পড়তে গিয়ে বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। পড়ার আর ধৈর্য নেই। অথচ তার এই অশ্লীল ভাষার বই নাকি রকমারিতে সবচেয়ে বেশি বিক্রির তালিকায়। এখন কাকে দোষ দেবেন—লেখককে, নাকি পাঠককে? সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে! কোনো প্রতিবাদ নেই। সবাই নিজেকে প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত, কে শোনে কার কথা! রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, শরত্চন্দ্র তারা তো এই ধরনের লেখা লেখেননি।

আরো কয়েক মাস আগে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তাও নজিরবিহীন। নোয়াখালীতে নারীকে তার ঘরে ঢুকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে তার স্বামীর উপস্থিতিতেই এলাকার একদল তরুণ বখাটে কর্তৃক। এই দায় সমাজের। সমাজের কিছু লোভী নেতা তাদের স্বার্থে এই বখাটে বাহিনী তৈরি করে।

এবার আসি ছিন্নমূল শিশুদের প্রসঙ্গে। অনেক ছিন্নমূল মেয়েশিশু নির্যাতিত হচ্ছে পথেঘাটে, তাদের খবর কেউ রাখে না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দিতে গিয়ে শুনতে পাই, একটি ছিন্নমূল ১৩ বছরের কিশোরী মারাত্মকভাবে নির্যাতনের শিকার হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাকে হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু তার চিকিত্সা সম্পন্ন না হতেই হসপিটাল কর্তৃপক্ষ তাকে হসপিটাল থেকে বের করে দেয়। কারণ সে ছিল এইচআইভি পজিটিভ। তার সঙ্গে যে দুই যুবক ইন্টারকোর্সে অংশগ্রহণ করে তাদেরকেও পুনর্বাসন করা হয়, কারণ তারাও পজিটিভ। তাই ছিন্নমূল পথশিশুদের অবিলম্বে সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। নতুবা সমাজের একটা বড় অংশ এই ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে এবং এভাবে অসহায় ছিন্নমূল মেয়ে শিশুগুলো নির্যাতিত হয়ে অসুস্থ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হবে, যা আমাদের সমাজের জন্য ভয়ংকর চিত্র হয়ে দাঁড়াবে। এইরকম আরো অনেক ঘটনা আছে, যা আড়ালেই রয়ে যায়, অনেক ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায়।

সমস্যার মূল সমাজের অনেক গভীরে। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। পরিবার ও সমাজকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। ছেলেমেয়েকে সময় দিতে হবে, তারা কী করে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে তা বাবা-মা তথা পরিবারকেই নজর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানের পাশাপাশি নৈতিক, সামাজিক, চারিত্রিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী বিপথগামী না হতে পারে।

n  লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক