লবণ উত্পাদনের প্রক্রিয়া কাদামাটি দিয়ে শুরু। মাটিতে উত্পাদিত হতো সামান্য পরিমাণ লবণের কণা। মাঠ থেকে কাদাসহ তুলে এনে কারখানায় খাবার উপযোগী করা হতো। সে অবস্থা বদলেছে। এখন পলিথিনের বদৌলতে মাঠেই পাওয়া যাচ্ছে সাদা চকচকে লবণ। চাষ প্রক্রিয়ায় এসেছে অনেক পরিবর্তন। বছর বছর বাড়ছে উত্পাদন। চেষ্টাটা চাষিদের। কিন্তু সম্ভাবনা বিকাশের উদ্যোগ নেই। যুগ যুগ ধরে অবহেলাই যেন নিত্য সঙ্গী লবণ-চাষিদের। লবণ চাষে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজার লবণ প্রকল্প কার্যালয়ের সূত্র মতে, চলতি ২০০০-২০২১ মৌসুমে লবণের চাহিদার বিপরীতে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৫০ লাখ মেট্টিক টন। গত বছরের উদ্বৃত্ত হিসেবে এখনো মজুদ রয়েছে প্রায় ৪ লাখ মেট্টিক টন লবণ।
জানা যায়, এক কানি (৪০ শতক) জমি লবণ-চাষিরা বর্গাচাষের জন্য ছয় মাসের ইজারা বা খাজনায় নেন জমির মালিক থেকে। আর এজন্য তাঁদের খাজনা দিতে হয় ১৪-১৫ হাজার টাকা। তারপর পলিথিন, পানি সেচ ও লেবারের জন্য ব্যয় হয় আরো প্রায় ১৫ হাজার টাকা। ছয় মাসের ন্যূনতম শ্রমিক মজুরি ২৫ হাজার। সাকুল্যে এক কানি জমিতে এক মৌসুমে খরচ ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। অথচ ছয় মাসের এই মৌসুমে জমি চাষের উপযোগী করতে প্রথম এক মাস বাদে বাকি পাঁচ মাসে লবণ উত্পাদিত হয় ২৫০-২৬০ মণ বড়জোর। আর মাঠপর্যায়ে প্রতি মণ (৪০ কেজি) লবণের দাম চাষিরা পান মাত্র ১৯০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। যার মধ্যে চাষিদের বহন খরচ বাদে ঐ দাম গিয়ে টেকে ১৬০-১৭০ টাকা। মৌসুম শেষে দেখা যায় ২৫০ মণ লবণে চাষিরা পান মাত্র ৪০ হাজারের মতো। আবার এতে এক মৌসুমে সব লবণ তারা বিক্রিও করতে পারেন না। যার কারণে বছরের পর বছর অনেক চাষির লবণ মজুদ করে রাখতে হয় মাঠে।
এদিকে ভোক্তাপর্যায়ে দেখা যায়, বাজারে আয়োডাইজ মিশ্রিত প্রতি কেজি লবণই কিনতে হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। অথচ মাঠপর্যায়ে এক কেজি লবণের দাম ৪ টাকারও কম। সিন্ডিকেটের পকেটে লাভ ঢুকলেও বঞ্চিত চাষিরা। উত্পাদন খরচের অর্ধেক দামও পান না তাঁরা। মাঠ থেকে এক কেজি লবণ উত্পাদন খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ছয় টাকা। ২০১৭ সালে ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলার জন্য সরকার জাতীয় লবণনীতি ২০১৬-র আলোকে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিলেও তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ফলে লবণ-চাষিদের দুঃখ-দুর্দশা চরমে। লবণশিল্পের সঙ্গে জড়িত দেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার এই বৃহত্তর খাতকে এভাবে হেলায় রেখে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে চাষিরা লবণ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এর মধ্যে অবশ্য কেউ কেউ লবণ চাষ ছেড়ে ঝুঁকছেন অন্যান্য পেশায়। তাই লবণশিল্পকে বাঁচাতে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত জরুরি।
মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
