স্বাধীনভাবে লেখালেখি এবং মত প্রকাশের জন্যই হত্যা করা হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক অভিজিত্ রায়কে। নাস্তিকতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্যরা তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী অভিযুক্তরা বেঁচে থাকলে ঐ জঙ্গি সংগঠনের যেসব সদস্য বিচারের বাইরে রয়েছেন তারাও একই ধরনের অপরাধ করতে উত্সাহী হবেন। এতে বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা লেখকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মত প্রকাশ করতে সাহস পাবেন না। কাজেই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য অপরাধ রুখতে পাঁচ আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। এতে নিশ্চিত হবে ন্যায়বিচার। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে অভিজিত্ হত্যা মামলায় আসামিদের দণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক জিয়া, আনসার আল ইসলাম জঙ্গি সংগঠনের সদস্য আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন ও আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম। জিয়া আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান। তবে মামলার অপর আসামি উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ফারাবী সরাসরি ঐ হত্যাকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অভিজিেক ‘হত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন’। দণ্ডিত ছয় আসামির মধ্যে জঙ্গি জিয়া ও আকরাম পলাতক রয়েছেন।
রায়ে বিচারক বলেন, মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মধ্য দিয়েই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। এতে একদিকে নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা শান্তি পাবেন, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সাহস পাবেন মুক্তমনা লেখকেরা। অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে কেউ ভয় পাবে ও নিরুত্সাহিত হবে।
আইনজীবীরা জানান, রায়ের পর ফারাবীকে কিছুটা বিমর্ষ দেখালেও বাকি তিন জন রায়ের আগে ও পরে ছিলেন একই রকম ‘উত্ফুল্ল ও উদ্ধত’। তাদের এক জন দুই আঙুল তুলে ‘ভি’ চিহ্নও দেখান। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে আসামিপক্ষ। দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে জিয়া, সায়মন ওরফে শাহরিয়ার, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব, আকরাম হোসেন ওরফে হাসিবকে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রায় ঘোষণার আগে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল চার আসামিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়। আদালতকক্ষ ও প্রাঙ্গণে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিত্ রায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখির পাশাপাশি পরিচালনা করতেন মুক্তমনা ব্লগ সাইট। জঙ্গিদের অব্যাহত হুমকির মুখেও তিনি ২০১৫ সালে একুশের বইমেলায় অংশ নিতে আসেন। ঐ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে তার ওপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিত্। ঐ সময় চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান বন্যা। এ ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে ছেলে হত্যার ঘটনায় অজয় রায় বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি) বরখাস্তকৃত মেজর জিয়াসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।
ঐ চার্জশিটে বলা হয়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আগের নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) নেতা জিয়াউল হক ওরফে জিয়ার ‘নির্দেশেই’ সেদিন অভিজিতের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয়। এতে আরো বলা হয়, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে অভিজিত্ ও তার স্ত্রী বন্যা বইমেলা থেকে বের হয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের উত্তর-পূর্ব রাস্তার ফুটপাতের ওপর আসেন। তখন আনসার আল ইসলামের অপারেশন শাখার চার জন অভিজিেক হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় বরখাস্তকৃত মেজর জঙ্গি জিয়া, সেলিম, আকরাম, মোজাম্মেল, আবু সিদ্দিক, মুকুল রানা চারপাশে গার্ড হিসেবে অবস্থান নেন, যাতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া জঙ্গিরা সেখান থেকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারেন। ঐ বছরের ৬ আগস্ট পলাতক দুই আসামিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ছয় আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে গতকাল এই রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।
বিচারের রায় দেখে যেতে পারেননি অভিজিতের বাবা-মা
রায়ের সময় অভিজিতের পরিবারের কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। অভিজিতের স্ত্রী বন্যা রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আর অভিজিতের বাবা এ মামলার বাদী অধ্যাপক অজয় রায় বিচারের রায় দেখে যেতে পারেননি। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় মন ভেঙে যায় তার। পরে শোক সইতে না পেরে স্ত্রীও গত হন। বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রয়াত হন অধ্যাপক অজয় রায়। অভিজিতের ছোট ভাই অনুজিত রায় বলেন, ‘আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট। তবে রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক। জিয়াসহ যারা পলাতক, যারা হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক। যদি গ্রেপ্তার করা না যায়, তাহলে আবার নতুন ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়।
