সেনাবাহিনী নিয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন আলজাজিরার ---------আইএসপিআর

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:৫৩

আলজাজিরায় ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে প্রচারিত প্রতিবেদনের বিষয়ে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪৬ মিনিটে ইমেইলে গণমাধ্যমে পাঠানো ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে আলজাজিরার মিথ্যা প্রতিবেদন’ শীর্ষক প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, তথ্যচিত্র আকারে পরিবেশিত প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে অসংখ্য ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সেনাবাহিনীর প্রধানকে বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্বদরবারে বিতর্কিত, অগ্রহণযোগ্য ও হেয়প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্যান্য অসত্য, বানোয়াট, মনগড়া, অনুমাননির্ভর ও অসমর্থিত তথ্য সংযুক্ত করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রথমত, পরিবেশিত তথ্যচিত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ইসরাইল থেকে স্পাইওয়্যার ক্রয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনীর প্রধানের ভাইকে সম্পৃক্ত করে কিছু মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। আলজাজিরা সিগন্যাল সরঞ্জামটি ইসরাইলের তৈরি বলে যে তথ্য প্রচার করেছে, তা আদৌ সত্য নয় এবং সরঞ্জামের কোথাও ইসরাইলের নাম লেখা নেই। আরো উল্লেখ্য যে, সেনাবাহিনীতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এবং অনেকগুলো পর্যায় অনুসরণ করে সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়। এখানে দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই।

গত ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে জাতিসংঘের ইউএনডিপি কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো ‘সিগন্যাল ইউনিটের পরিবর্তে একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে মোতায়েন করতে সক্ষম কি না, জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি উল্লেখিত ইউনিটের প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের তালিকা জাতিসংঘ কর্তৃক পাঠানো হয়। ঐ তালিকা অনুযায়ী সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রয়োজন বলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক ৫ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে জাতিসংঘকে অবহিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ যথাযথ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হাঙ্গেরি থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ সালে একটি প্যাসিভ সিগন্যাল ইন্টারসেপ্টর ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে, যা জুন ২০১৮ সালে সম্পন্ন হয়। এই সরঞ্জাম জাতিসংঘের চাহিদা মোতাবেক ক্রয় করা হলেও পরে জাতিসংঘ তানজানিয়ার একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কঙ্গোতে মোতায়েন করায় উক্ত সরঞ্জাম অদ্যাবধি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছেই অব্যবহূত অবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে জাতিসংঘের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তাছাড়া এই সিগন্যাল সরঞ্জামের ক্রয় প্রক্রিয়া বর্তমান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগেই শুরু হয়। অতএব, ঐ সিগন্যাল সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে বর্তমান সেনাবাহিনীর প্রধান বা হাঙ্গেরিতে বসবাসকারী তার ভাইয়ের কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যে সম্পূর্ণ অসত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে বলা আবশ্যক যে, সেনাবাহিনীর প্রধানের কোনো ভাই বা আত্মীয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোনো ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম সরবরাহ অথবা ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। এটি সহজেই অনুমেয় যে এই তথ্যচিত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি স্বনামধন্য ও সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তার পরিবারের ওপর কালিমা লেপনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা করার অপপ্রয়াস মাত্র।

এদিকে গত ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে সেনাবাহিনীর প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। অথচ তার আগেই সেনাবাহিনীর প্রধানের ভাইয়েরা (আনিস ও হাসান) তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিতভাবে দায়েরকৃত সাজানো ও বানোয়াট মামলা থেকে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অব্যাহতি পান। অতএব, বিষয়টি স্পষ্ট যে প্রতিবেদনে দেখানো সেনাবাহিনীর প্রধানের তার প্রবাসী ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহ অনুষ্ঠানে এবং মালয়েশিয়ায় সাক্ষাতের ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পলাতক আসামির সঙ্গে সাক্ষাত্ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি নির্লজ্জ অপপ্রচার মাত্র।

এখানে উল্লেখ্য যে, আলজাজিরার প্রতিবেদনটিতে সামি নামের যে ব্যক্তির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তার প্রকৃত নাম সামিউল আহমেদ খান। পিতা লে. কর্নেল মরহুম আব্দুল বাসিত খান (অব.)। সামিকে ইতিপূর্বে চুরি, সেনাবাহিনীর অফিসারের পোশাক এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে প্রতারণার অপরাধে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করা হয়। এসব অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালে তাকে বাংলাদেশের সব সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। উল্লেখিত সামিউল আহমেদ খান বর্তমানে জুলকারনাইন সায়ের খান (বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর ইজি০০৯২৯০২, পূর্বের পাসপোর্ট নম্বর বিজে০৫২০২৬০, এসি৫০৭৫৬৪৭ এবং বি১৭৬৫৬৪৯) নাম ধারণ করে এবং তার পিতার নাম কর্নেল ওয়াসিত খান ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে পলাতক অবস্থায় হাঙ্গেরিতে বসবাস করছে। উল্লেখ্য, এই প্রতারক, অর্থলোভী এবং জালিয়াত সামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে রমনা মডেল থানায় গত ৫ মে ২০২০ তারিখে একটি মামলা দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

মূলত, এই প্রতিবেদনদৃষ্টে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ের কিছু খণ্ড খণ্ড ছবি বা দৃশ্য সংযোজন করে একটি অনুমাননির্ভর, অগ্রহণযোগ্য ও প্রমাণবিহীন তথ্য দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি তথ্যচিত্র সম্পাদনার কাজ করা হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনের প্রায় সম্পূর্ণ বিষয় অসমর্থিত শোনা কথা (হিয়ার সে) নির্ভর এবং তথ্য প্রদানকারীকে অপর পক্ষ কর্তৃক কোনো প্রশ্ন বা জেরার মুখোমুখিও করা হয়নি। এছাড়া সামির মতো একজন প্রতারক ও পলাতক ব্যক্তির কাছ থেকে একতরফাভাবে প্রাপ্ত ও সাক্ষ্য হিসেবে অনির্ভরযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ভিত্তিহীন তথ্যচিত্র তৈরি করার কারণে এই প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্যতা, প্রাসঙ্গিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান ও তার পরিবারকে সরাসরি মাফিয়া পরিবার হিসেবে উল্লেখ ও উপস্থাপনের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের সরকার কর্তৃক আইন অনুযায়ী নিযুক্ত সেনাবাহিনীর প্রধান সম্পর্কে সাংবাদিকতার রীতি ও নীতি গর্হিতভাবে এরূপ অপবাদ ও মিথ্যাচার চূড়ান্তভাবে অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত এবং আলজাজিরার মতো একটি সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে যা আদৌ কাম্য নয়। পেশাগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ, সবার কাছে অতি গ্রহণযোগ্য সেনাবাহিনীর প্রধানকে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া আলজাজিরা কর্তৃক অসত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন এবং কাল্পনিকভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত করার অপপ্রয়াস সেনাবাহিনী ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।