দায়িত্ব গ্রহণের পর হইতে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র রাজধানীর অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়া আসিতেছেন। এই হুঁশিয়ারি যে কেবল কথার কথা নহে, কিছুদিনের মধ্যেই আমরা তাহার দৃষ্টান্ত দেখিতে পাই। দক্ষিণের মার্কেটগুলি হইতে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করেন মেয়র। ইহারই ধারাবাহিকতায় গত ৮ ডিসেম্বর হইতে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এ নকশাবহির্ভূত ৯১১টি দোকান উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ডিএসসিসি। একইভাবে ১৭ ডিসেম্বর হইতে গুলিস্তান এলাকার সুন্দরবন স্কয়ার সুপার মার্কেটে নকশাবহির্ভূত ৭৫৩টি দোকান উচ্ছেদে অভিযান শুরু হয়। তবে সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত সরেজমিন প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ঘটা করিয়া উচ্ছেদের পর পুনরায় ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এবং সুন্দরবন স্কয়ারে বিভিন্ন দোকান বসিয়াছে। অভিযোগ রহিয়াছে, উচ্ছেদের পর সিটি করপোরেশনের লোকদের তদারকি দূরের কথা, উচ্ছেদ হইতে সৃষ্ট বিভিন্ন বর্জ্যও পরিষ্কার করা হয় নাই।
দোকানগুলি যেহেতু অবৈধ ছিল, সুতরাং উহা লইয়া অধিক কিছু বলিবার নাই। তবে একদমই কিছু বলিবার নাই—তাহা নহে। এই পৃথিবীতে বৈধ-অবৈধের দ্বন্দ্ব অনেক প্রাচীন। আইন ও নিয়মের বাহিরে গেলেই তাহাতে আমরা ‘অবৈধ’ তকমা দাগাইয়া দিতে পারি। তবে আইন ও নিয়ম কোনো ঐশী বিষয় নহে। ইহার নিত্য পরিবর্তন আমরা দেখিতে পাই। পরিবর্তনই স্বাভাবিক। ন্যূনতম নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব নহে। তবে স্থান-কাল ও পাত্র অনুযায়ী একই নিয়মকানুনের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা আমরা দেখিতে পাই। উন্নত বিশ্বের সামান্য জনঘনত্বের জনপদে যেই নিয়মশৃঙ্খলা খুব সহজে মানা সম্ভব, তাহা আমাদের দেশে বহু ক্ষেত্রেই সম্ভব নহে। বিপুল জনঘনত্বের এই দেশে মানুষ যদি খাইয়া-পরিয়া না বাঁচিতে পারে, তাহা হইলে নিয়ম হইয়া উঠিবে অমানবিকতার চূড়ান্ত। রাষ্ট্র কি তাহার সাধারণ নাগরিকের উপর এতখানি অমানবিক হইতে পারে? ইতিপূর্বে দেশের ২২টি মহাসড়ক হইতে ‘অবৈধ স্থাপনা’ উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়াছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাহার পর? উচ্ছেদ হয় বটে, তবে তাহার স্থায়িত্ব খুব বেশি দিন হয় না। ইহা সত্য যে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা চলিতেছে। তীব্র যানজট, দুর্ঘটনা ও ভাঙাচোরা সড়কে চলাচল আরো অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়া থাকে। এই পরিস্থিতির জন্য পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সড়কের কোল ঘেঁষিয়া গড়িয়া উঠা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। তবে সড়ক-মহাসড়কের সকল স্থাপনাই কিন্তু অবৈধ নহে। ‘সড়ক ও জনপথের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫’-তে বলা হইয়াছে যে, সড়ক ও জনপথের অব্যহূত ভূমি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য লিজ লইতে পারিবেন জনগণ। সরকারের নিকট হইতে নিয়মমাফিক নেওয়া লিজ নিশ্চয়ই অবৈধ নহে। একইভাবে ঢাকার সিংহভাগ ব্যস্ত রাস্তার সংযোগস্থল ও ফুটপাতে কেনাকাটার দৃশ্য চোখে পড়িবে। এই অবাধ হকারবৃত্তি সমগ্র দেশেরই সাধারণ চিত্র।
হকার থাকিবেই, সমগ্র বিশ্বেই রহিয়াছে। ‘পজিশন’ বা ‘টং দোকানের’ জন্য অল্পবিস্তর চাঁদার বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ তাহাদের অন্নসংস্থান করিয়া থাকেন এই হকারবৃত্তির মাধ্যমেই। পথচলতি মানুষও তুলনামূলক অল্পমূল্যে জিনিস খরিদ করিতে পারে এই সকল কথিত ‘অবৈধ’ দোকান হইতে। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম কিছু করিয়া খাইবার এই চেষ্টা একদিকে রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচকও। কারণ তাহারা কঠিন শ্রম দিয়াই নিজেদের অন্নসংস্থান করিতেছেন। পথে পথে ঝামেলা, পদে পদে হয়রানির পরেও তাহারা আমাদের অর্থনীতির অনেক চাকার একটি। আবার ‘বৈধ’ হইয়া গেলেই যে তাহা সমস্যামুক্ত—এমন নহে। অর্থাত্ সমস্যা রহিয়াছে বৈধ এবং অবৈধ—উভয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই। সুতরাং আমরা মনে করি, যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও দোকান করিবার সুযোগ দেওয়া যায়। সমগ্র বিশ্বেই ইহার উদাহরণ রহিয়াছে। একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই পারে এই ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে।
