আমরা একে অপরের পরিপূরক

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৪৬

আমাদের বিতর্কের বিষয়বস্তু কখনোই পুরুষ বনাম নারী হওয়া শোভনীয় নয়। কারণ আমরা কেউ কারো প্রতিপক্ষ বা শত্রু নই, প্রতিনিয়ত একে অপরের পরিপূরক। প্রকৃতপক্ষে, পুরুষ মানুষ মঙ্গল গ্রহের কেউ নয়। তারা আমাদেরই পিতা, ভ্রাতা, স্বামী কিংবা সন্তান। তদ্রূপ আমরাও তাদের কন্যা, জায়া, জননী কিংবা ভগিনী। তাদের নিয়ে অযথা কেন আমরা তর্কের খাতিরে তর্ক করে বিভাজন সৃষ্টি করব!

নারী হলো সমাজের অর্ধেক আকাশ। নারীবিহীন সমাজ এ জগত্ সংসারে চিন্তার অতীত। তাদেরকে ছাড়া জীবন সংসার অসার ও আনন্দহীন। তার পরও আদর্শ মানুষ হতে গেলে পুরুষকে যতটা নিজেকে বদল করতে হয়, নারীকে তার চেয়ে বেশি বদল করতে হয়। আর সে কারণে পুরুষ আদর্শ মানুষের গুণাগুণ আয়ত্ত করার মধ্য দিয়ে সমাজে একটা প্রভূত্বের আসন অধিকার করে। আর নারী ক্ষেত্র বিশেষে পায় আশ্রিতের ভূমিকা। সেদিক বিবেচনা করে বলা যেতে পারে মেয়েদের কোনো না কোনো অর্থকরী কাজে নিযুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়া উচিত। এই বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। যত দিন পর্যন্ত সমাজে এই ধরনের ধারণা বলবত্ থাকবে যে, পুরুষেরা আয় করে আর নারীরা সেই আয়ের অংশে নিজেদের জীবন ধারণ করে এবং নারীরা বিলাসিতা করে, ততদিন পর্যন্ত নারীরা কখনোই সংসারে পুরুষদের সমমর্যাদা আশা করতে পারবে না।

ছোট্ট সীমারেখার মধ্যে নারীদের দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে বলে তার চরিত্রে এমন কিছু সংকীর্ণতা এসে ভর করে যা সে সহজেই অতিক্রম করতে পারে না। এই পথ অতিক্রম করার সোপানই হচ্ছে তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে এবং তাকে স্বনির্ভর হতে হবে।

সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সক্রিয় ভূমিকা ও অবদান প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। যাকে কোনোভাবেই সমাজ অস্বীকার করতে পারে না।

আমরা প্রযুক্তিতে আধুনিক এবং অর্থনীতিতে মুক্তির পথে অগ্রসর হচ্ছি ঠিকই, তথাপি নারীর শিক্ষা, নারীর স্বাধীনতায় সেরকম আধুনিক হতে পারিনি। তবে এই ধরনের বৈষম্য সৃষ্টির মূলে আমাদের নারীদেরও নেতিবাচক মনোভাবও পুরোপুরি দূর হয়নি। সেই ক্ষেত্রে সমাজ বা রাষ্ট্রকে দোষারোপ করার পূর্বে আমাদের পারিবারিক বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করতে হবে সর্বপ্রথম।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী স্বভাবতই বলেছেন, ‘জীবনসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে উঠবার মই হচ্ছে শিক্ষা’।

সত্যিই মানুষকে যেমন জন্মের পর শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে জীবনসত্তা থেকে মানবসত্তায় পদার্পণ করতে হয়, তেমনি শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত না হলে তাকে সুশিক্ষিত বলা যায় না।

মানুষের মধ্যে সুশিক্ষার আলো প্রতিফলিত হলেই মূল্যবোধ জাগ্রত হবে। এই মূল্যবোধ নর-নারী নির্বিশেষে প্রত্যেকের জীবনেই অপরিহার্য। তবেই নর-নারী উভয়ের প্রতি উভয়ে দায়িত্বজ্ঞান ও সম্মানবোধ জন্মাবে। আমাদের উভয়ের নৈতিক দায়িত্ববোধ না জাগলে কখনোই ইতিবাচক প্রভাবের প্রতিফলন সমাজে কখনোই ঘটবে না।

নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মানুষ ও অমানুষের পদচারণা। তাই আমাদের জন্য নারী বনাম পুরুষের বৈষম্য ত্যাগ করে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে হবে, ‘মানুষ বনাম অমানুষ’-এর বৈষম্য নিয়ে। উত্তাল সুন্দরের জোয়ারে বেগবান হতে হবে প্রতিটি সৃজনশীল মানুষকে। জীবনের প্রতিটি ধাপে মনে রাখতে হবে, মানুষই মানুষের পরম বন্ধু। আবার এই মানুষই জীবনের তাগিদে স্বার্থের প্রয়োজনে চরম শত্রু। এখানে নারী-পুরুষ বলে কোনো ভেদাভেদ নেই। সর্বপ্রথম আমাদের মনোজগতের ভেতর যে চেতনা জাগ্রত করতে হবে সেটা হচ্ছে ‘আমরা মানুষ’। এটাই আমাদের প্রথম পরিচয়। আমরা কে পুরুষ আর কে নারী অথবা কে মুসলিম আর কে অমুসলিম সেটা মানবতা বা অধিকারের ক্ষেত্রে মুখ্য বিষয় নয়।

সুস্থ-সুন্দর সংসার জীবনে নতুুন প্রজন্মকে ভবিষ্যত্ সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবা-মায়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বাবা-মা যেকোনো একজনের অভাববোধ থেকে সংসারের সুখ ঝরা পাতার মতো শুকিয়ে যায়। সেই সংসারে অস্ফুট কলি অলখে হারিয়ে যায় প্রতিনিয়ত। তাতে সমাজ-দেশ জনসম্পদ হারাতে বসে। তাতে সমাজ হয় কলুষিত।

পৃথিবীর প্রতিটি আনন্দ সৃষ্টির মূলেই রয়েছে নর-নারীর সম্মিলিত ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।

নজরুলের ‘নারী’ কবিতার এই উচ্চারণগুলোকে আমরা প্রতিনিয়ত সাধুবাদ জানাই—

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,/প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।

n লেখক : সহকারী অধ্যাপক সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি