কোভিড সময়কালে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি ও সম্প্রসারণ বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে জীবন ও জীবিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক সংযুক্তি ক্রমশ মূল্যবোধ তৈরির পাশাপাশি সৃজনশীল শক্তি ও ধীশক্তির উদ্ভাবন নতুন তাত্পর্যমণ্ডিত সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। উদ্যোক্তা কোনো ব্যাবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করলে শেষ পর্যন্ত তা সফল হবে কি না, বিশ্বের কোনো দেশেই তার স্থির নিশ্চয়তা কিন্তু নেই এবং এ কারণে উদ্যোক্তা হতে হলে মন-মানসিকতা ঝুঁকি গ্রহণের পাশাপাশি ব্যর্থ হলে বিকল্প ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি আন্তরিক হতে হবে। সৃষ্টির প্রারম্ভ থেকে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক বিচারবোধের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডলি বিরাজ করেছে। যদিও অনেকের ক্ষেত্রে তাদের আচরণগত বহিঃপ্রকাশ কালে কালে ঘটেছে আবার অনেকের আচরণগত ধারণাগুলো বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থানগত কারণে চাপা পড়ে গেছে। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য পরিবেশগত স্ক্যানিংয়ের প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে দেখা দিয়ে থাকে। বৈরী সময়েও যারা নানা প্রতিকূলতা নব-উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেদের ধীশক্তির বিকাশ ঘটাতে পারেন, তারাই পৃথিবীতে সফল উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত।
আবার কখনো ধ্বংসযজ্ঞের বিশালতায় মেতে উঠেছে। উদ্যোক্তা শব্দটি ফরাসি শব্দ এন্ট্রিপ্রেনড্রি থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে ‘গ্রহণ করা’। বর্তমান যুগে অনেক বেশি মাত্রায় করপোরেট ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এদিকে বাজার ব্যবস্থাপনায় উদ্যোক্তা শব্দটি অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বর্তমানে যে বাংলাদেশে দৃশ্যমানভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, এতে নানামুখী কার্যকরণ রয়েছে। কোভিড-১৯-এর কারণে অর্থনৈতিক বিকাশ কিছুটা শ্লথ হলেও দেশে সার্বিকভাবে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ঘটছে। তবে দুর্নীতি যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং যিনি যে সংস্থার দায়িত্ব পাবেন, সেখানে সরকারের সাধুনীতি যাতে বাস্তবায়ন করেন, সেজন্য অবশ্যই তদারকি ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করলেই হবে না, বরং কোনো ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঋণখেলাপিদের সম্পৃক্ত করা যাবে না, তেমনি দোষী ব্যক্তিবর্গ যাতে বর্তমানে যেমন বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আসছে, সেটিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। কেননা, উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যমুক্ত কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় করতে হবে। ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এদেশে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ২০০৯ থেকে শুরু হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিসমূহ ছিল নতুন উত্পাদন প্রক্রিয়ার প্রবর্তন করা, পণ্যের বহুধাবিভক্তিকরণ এবং গুণমান বৃদ্ধি করে রপ্তানিমুখী পণ্যের প্রবর্তন করা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে শক্তিশালীকরণ, ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াকে সুসংহতকরণ, ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ডকে দুর্নীতিমুক্তভাবে ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যমুক্তভাবে ব্যবসায় পুনঃসংগঠিত করার প্রয়াস। সরকারের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ছিল না। তবে কোনো কোনো বাস্তবায়নকারী বিশেষত মধ্যম ও নিম্ন পর্যায়ে একধরনের অনীহা না থাকলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরো বেশি বেগবান হতো বলে প্রতীয়মান হয়। ব্যবসাপদ্ধতিকে সহজতর করা দরকার। উদ্যোক্তারা আগের বৈশিষ্ট্যগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন। তবে যে কোনো উদ্যোক্তা তার চিন্তাভাবনা, মেধা ও মননের পাশাপাশি উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়নের একটি বড়সড় ভূমিকা রয়েছে। সরকার গত বছর করোনা ভাইরাসের মহামারির সময়ে যদিও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন কিন্তু অদক্ষ নীতিমালার কারণে উদ্যোক্তারা সে অর্থের বরাদ্দের অর্ধেকও পাননি। যাদের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সাহায্য স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বেশি কাজ করত। যারা ব্যাংকিং খাত পরিচালনা করেন, তারা যদি সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতিমালা বাস্তবায়নে অক্ষম হন, তাহলে তা সাধারণ জনমানুষের জন্য ভালো ফল দেয় না। দেশের পুঁজিবাজার কিন্তু ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রে অদ্যাবধি কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেয়নি। তেলবাজি করে একটি পর্যায় পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তু যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকারপ্রধান কাজ করে চলেছেন, সেটিকে অবশ্যই নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা দরকার। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (IFC) গত বছরের শেষ দিকে এক হিসাবে বলেছিল যে, দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সরকারের ঘোষিত পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় মাত্র ০.৪ শতাংশ প্যাকেজ ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছ থেকে পেয়েছিল।
আজকাল অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বঙ্গবন্ধু যে উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে মানবকল্যাণের জন্য তৈরি করেছিলেন, সঞ্চয়-বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরি তা থেকে দূরে সরে গেছে। আসলে ব্যাংকার যখন তার মনমানসিকতা সম্পূর্ণরূপে মানবকল্যাণ বিমুখ করে ফেলেন, তখন ধনীশ্রেণির প্রতি তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়; যেটি কিনিসীয় অর্থনীতির শুরুর প্রারম্ভে উনিশ শতকে যুক্তরাজ্যে হয়েছিল। সামষ্টিক অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য সরকারপ্রধানের উদ্যোগ বাস্তবায়নকারীদের ভুল সিদ্ধান্তে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। এজন্য অবশ্য যারা বাস্তবায়ন করবেন না, তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। সময় এসেছে হিসাব করে দেখার—গ্রামীণ অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে কী পরিমাণ অর্থ শহরাঞ্চলে আসে এবং কী পরিমাণ অর্থ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শহর থেকে গ্রামীণ অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য যায়। অর্থনীতির মৌলিক প্রশ্নটি সঞ্চয়-বিনিয়োগের ভারসাম্য যদি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেখানো না যায়, তাহলে এটি লেনদেনের ক্ষেত্রে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে, ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য গড়ে দিচ্ছে। এই অব্যবস্থাকেও আবার অনেক পণ্ডিত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গুণগান করছে—শুভংকরের ফাঁকি, যেটি ডিপেনডেন্সি তত্ত্বকে বাস্তবায়ন করিয়ে দেয়, সে ব্যাপারে প্রশংসা করলেও বাস্তবে কী হচ্ছে সেটি দেখে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকার দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের প্রসারকে নিয়ে যে চিন্তাভাবনা করে তার আলোকে চলতি বছরে ক্ষুদ্র-মাঝারি ও কুটিরশিল্পগুলোকে সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সম্প্রসারণের জন্য দুটো পুনরুদ্ধার প্যাকেজের আওতায় ২৭ বিলিয়ন টাকা সাহায্য প্রদান করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই কর্মসূচির আওতায় এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৩ বিলিয়ন টাকা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের মাধ্যমে ১ বিলিয়ন টাকা, জয়িতা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৫০০ মিলিয়নসহ একটি প্যাকেজে ১৫ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এনজিও ফাউন্ডেশন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ৫০০ মিলিয়ন টাকা, সামাজিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ৩ বিলিয়ন টাকা, পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৩ বিলিয়ন টাকা, ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১ বিলিয়ন টাকা এবং বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৩ বিলিয়ন টাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ করেছেন। এখন যাতে বরাদ্দকৃতরা যথাযথভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমএসএমই (MSME) খাতে সঠিকভাবে ব্যয় করেন, তার একটি তদারকি ব্যবস্থা থাকা দরকার। এদিকে দ্বিতীয় কর্মসূচির আওতায় ১২ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে—যার অধীনে ১৫০টি উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা বা অসহায় নারীরা ২০২১-২২ অর্থবছরে একটি ভাতা কার্যক্রমের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। বাদবাকি ৩৪২টি উপজেলার ক্ষেত্রে প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা বা অসহায় নারী, প্রতিবন্ধী এবং তৃতীয় লিঙ্গ, হরিজন শ্রেণি ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর জন্য যাতে আরেকটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয় এবং টার্গেট গ্রুপের কাছে সরাসরি অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয় এবং নিকটস্থ কৃষি ব্যাংক, রাকাব কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং উন্নয়ন ব্যাংকে সম্পৃক্ত করে কৃষি অথবা অকৃষিজ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আওতায় যাতে আনা যায়, তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকারের কাছে অর্থ বরাদ্দের জন্য আবেদন করা এবং সেই আবেদন মঞ্জুর হলে জননেত্রীর নির্দেশিত পথ ধরে বাস্তবায়নের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যাতে দণ্ডিত হন, সেজন্য অবশ্যই নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুসংহত নীতিমালার আলোকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মাধ্যমে জীবনের মূল স্রোতোধারায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হতে হবে।
n লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট এবং আইটি এক্সপার্ট
