বেকারত্ব দূরীকরণে প্রাণিসম্পদ

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৪৪

আবহমানকাল ধরে মানুষের বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নে প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গ্রামীণ বাংলার হাঁস, মুরগি, কবুতর, গরু, ছাগল, ভেড়া, শূকর পালন বর্তমান সময়ে আরো রূপান্তরিত ও পরিণত হয়ে আধুনিক খামার শিল্প হিসেবে বিস্তৃতি পেয়েছে। বিগত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল প্রায় ১.৫৩ ভাগ। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অন্যান্য খাতের মতো এ শিল্পটিও কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। বিশেষত প্রাণিজাত পণ্য যেমন মাংস, দুধ, ডিম, প্রসেসড ফুড, দুগ্ধজাত পণ্য ইত্যাদি বাজারজাতকরণ ব্যাহত হয়েছে। ফলে অনেক খামারি এবং বাণিজ্যিক উদ্যোক্তাগণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯ অনুসারে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.১৯ শতাংশ। কোভিড ১৯ প্রাদুর্ভাবকালীন দেশে ৫৩.৬৪ শতাংশ মিলিয়ন মানুষ বেকার হয়েছেন, যাদের প্রতিদিনের আয় মাত্র ১৬০ টাকা বা ১.৯ ডলার। গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গড় পারিবারিক আয় কমেছে ৭৪ শতাংশ। এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, টারকি পালন বেকার জনসম্পদকে আলোর পথ দেখাতে পারে। বর্তমান বাজারে পাঁচটি উন্নত জাতের মাংস বা দুধ উত্পাদনকারী বাছুরের দাম সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার-৩৮ হাজার টাকা। যদি মাংস উত্পাদনকারী ছয় মাস বয়সি বাছুর তিন মাস লালনপালন করা হয় তাহলে পাঁচটি বাছুরের জন্য তিন মাসে খাদ্য ও অন্যান্য খরচ বাবদ সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। তিন মাস লালনপালন করে ৯ মাস বয়সি এ গরুগুলোর প্রতিটির দাম হবে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা। অর্থাত্ পাঁচটি বাছুরের মোট ক্রয় ১ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং লালনপালন খরচ ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকাসহ পাঁচটি গরুর মোট খরচ দাঁড়ায় ২ লাখ থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে পাঁচটি গরুর বর্তমান বাজারে বিক্রয় মূল্য ৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাত্ তিন মাসে নিট লাভ হচ্ছে ২ লাখ থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে আয় দাঁড়ায় ৭২ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। দেশের বেকার সম্প্রদায় এ বিষয়টির প্রতি নজর দিলে তাদের বেকারত্বের হতাশা যেমন কমবে তেমনি সমৃদ্ধ হবে দেশের প্রাণিপুষ্টি এবং অর্থনীতি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন মাংস দরকার ১২০ গ্রাম। দেশে প্রতি বছর মাংস (হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল) উত্পাদন হয় প্রায় ৭৫.১৪ লাখ টন (অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৯)।

প্রতি বছর দুধ উত্পাদন হয় প্রায় ১.৩৩৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং ডিম উত্পাদন হয় প্রায় ১৫.৫২ মিলিয়ন পিস (অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৫)। বাংলাদেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন দুধের চাহিদা ২৫০ মিলি এর বিপরীতে প্রাপ্যতা হচ্ছে ১৬৫.০৭ মিলি। অর্থাত্ মাংস ও ডিম উত্পাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও দুধ উত্পাদনে আমাদের ঘাটতি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে দুধ উত্পাদনে মহিষ বা গরুর খামার অনেক সম্ভাবনাময় একটি খাত। পাশাপাশি মাংস ও ডিমের উত্পাদন বৃদ্ধি করে রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যুবনীতি-২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে যুবক ধরা হয় ১৮-৩৫ বছর বয়সকে। বর্তমানে দেশে ৫.৫ কোটি যুব সম্প্রদায় রয়েছে। এ বিশাল যুব সম্প্রদায়ের একটি অংশকে উত্সাহ, প্রণোদনা ও সামান্য কিছু মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে যদি বিপুল সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ খাতে সম্পৃৃক্ত করা যায়, তাহলে মাংস, ডিম, দুধের উত্পাদন বুদ্ধির মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বহির্বিশ্বে প্রসেসড ফুড  যেমন—লিকুইড মিল্ক, দধি, চিজ, আইসক্রিম, পনির, মাখন, ছানা, প্রসেসড  চিকেন, প্রসেসড বিফ, প্রসেসড মাটন ইত্যাদির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ঘোষিত ভিশন-২০২১ এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে বিপুল সম্ভাবনাময় প্রাণিসম্পদ খাতকে অব্যশই রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তরিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ।

বর্তমানে দেশে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয় ৫৫০ টাকা কেজি এবং খাসির মাংস বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা। উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিকে যেমন মাংসের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের পুষ্টিচাহিদা পূরণ যেমন সম্ভব তেমনি রপ্তানিও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। একটি সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠনে প্রাণিজ পুষ্টির কোনো বিকল্প নেই। একটি উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে যে দক্ষ ও মেধাবী কর্মশক্তি দরকার তা নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা একটি উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে অবশ্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থেকে যুব সম্প্রদায়কে কর্মক্ষম রেখে এগিয়ে যেতে হবে।

n লেখক : প্রকল্প পরিচালক,

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা।