ঋণ গ্রহণের সময় ডলারের যে দাম ছিল, ঋণের মেয়াদকালীন বাড়তি দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। যে টাকা তিনি নেননি সেই পরিমাণ টাকাও ব্যাংকগুলো নিয়ে নিচ্ছে। এক জন উদ্যোক্তা ঋণ গ্রহণের সময় ডলারের দাম যদি ৫০ টাকা থাকে, এখন তা ৮৬ টাকা। তাহলে এ বাড়তি ৩৬ টাকা উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে নেননি। কিন্তু এই টাকা তাকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রকারান্তরে উদ্যোক্তা বাড়তি এই বোঝা টানতে না পেরে একসময় খেলাপি হয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রক্রিয়াগত কারণে ঋণখেলাপির তকমা কাঁধে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া দণ্ডসুদ ও নানা রকম চার্জ আরোপ করায় উদ্যোক্তারা ধরাশায়ী হচ্ছেন। অবশ্য ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিষয়টি আলাদা।
করোনার কারণে এমনিতেই ব্যবসা বাণিজ্য অনেকটা স্থবির। গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উত্পাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। এর ওপর ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঋণের পরিমাণও বেড়েছে তাদের। সবমিলিয়ে উদ্যোক্তারা কারখানা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমার কারণে রপ্তানি বাণিজ্যও কমেছে। এসব কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা বিপাকে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি প্রকল্পের বিপরীতে যখন ঋণ প্রদান করা হয়, তখন ডলারের যে মূল্য থাকে পরবর্তী সময় তা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে শ্রম মজুরি, কাঁচামালসহ আনুষঙ্গিক খরচও বেড়ে যায়। যা সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত ২০ বছরে ডলারপ্রতি ৩০ টাকা বেড়েছে। ২০০০ সালে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের মূল্য ছিল ৫৪ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৭১ টাকা। আর বর্তমানে তা বেড়ে ৮৫ টাকার ওপরে চলে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিল্প খাতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটে পণ্যের মান কমছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যমূল্য কমছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার পরও নিয়মিত কিস্তি দিয়ে গ্রাহক ব্যাংকের দায়মুক্তি পাচ্ছে না। উপরন্তু কিস্তি খেলাপি হলে সুদের ওপর দণ্ডসুদ আরোপ করা হচ্ছে। যা খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে বাড়তি ডলারের মূল্য এবং অন্যদিকে দণ্ডসুদ ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা না থাকায় কারখানাগুলো পুরোদমে উত্পাদনে যেতে পারছে না। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উত্পাদন অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) হিসাবমতে, দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ এখনো কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর সংক্রমণও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তাদের ক্যাপাসিটির অর্ধেক উত্পাদন করছে। এমন পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন ব্যাবসায়িক খরচ মিটিয়ে মুনাফা পর্যায়ে যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
