ইত্তেফাক ডেস্ক
রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর নাসার মহাকাশযান পারজিভারেন্স (বাংলায় যাকে বলা হয় অধ্যাবসায়) রোবট সফলভাবে মঙ্গল গ্রহের বুকে অবতরণ করেছে। ইতিমধ্যে এটি সেখান থেকে ছবি পাঠাতে শুরু করেছে। গ্রহের বিষুব অঞ্চল, যার নাম জেযেরো, তার কাছে গভীর এক গহ্বরে এই রোবটকে নামানো হয়েছে। নভোযানটি মঙ্গলের মাটি স্পর্শ করার মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েন ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার মিশন কন্ট্রোলের প্রকৌশলীরা। খবর বিবিসির।
ছয় চাকার এই রোবটযান আগামী দুই বছর মঙ্গল গ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে। প্রাচীন হ্রদ এলাকার মাটি পাথরের মধ্যে খনন চালিয়ে এটি অতীত অণুজীবের অস্তিত্ব সন্ধানের কাজ করবে। ধারণা করা হয় জেযেরোয় কয়েক শ কোটি বছর আগে বিশাল একটি হ্রদ ছিল। সেই হ্রদে ছিল প্রচুর পানি এবং খুব সম্ভবত সেখানে প্রাণের অস্তিত্বও ছিল।
পারজিভারেন্সের রোবটযানটি প্রথম যে দুটি ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, সে দুটি তোলা হয়েছে দুর্বল শক্তির প্রকৌশলী ক্যামেরা দিয়ে। ক্যামেরার লেন্সে ধুলার আস্তরণের মধ্য দিয়ে এই রোভার অর্থাত্ ঐ রোবটযানের সামনে ও পেছনে সমতল ক্ষেত্র দেখা যাচ্ছে। নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, রোবটযানটি জেযেরোর বদ্বীপের মতো চেহারার একটি অংশের দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবতরণ করেছে। এই এলাকাতেই পারজিভারেন্স তার সন্ধান কাজ চালাবে।
বিজ্ঞানীরা কেন এত উত্সাহিত :জেযেরোতে বিভিন্ন ধরনের পাথর রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মাটি, পাথর এবং কার্বোনেটস। বিজ্ঞানীদের উত্সাহের কারণ হলো, এ ধরনের পাথরের যে কোনো রকম অণুজীবের অস্তিত্ব সংরক্ষণের ক্ষমতা রয়েছে। ফলে সুদূর অতীতে এই গ্রহে যদি প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে এই পাথরের মধ্যে তার ইঙ্গিত মেলার আশা করছেন তারা। প্রাচীন হ্রদের যেটা তীর ছিল, সেখানে পলির মতো যে সেডিমেন্ট রয়েছে—যাকে বলা হচ্ছে ‘বাথটাব রিং’। বিজ্ঞানীরা সেটা বিশ্লেষণ করতে বিশেষভাবে আগ্রহী।
প্রাণের সন্ধান চালানো হবে কীভাবে :বর্তমানে মঙ্গল গ্রহের আবহাওয়া বেঁচে থাকার অনুকূল নয়। সেখানে আবহাওয়া এতই ঠান্ডা যে পানি সেখানে তরল অবস্থায় থাকতে পারে না। বায়ুমণ্ডলও এতই পাতলা যে চড়া আলোকরশ্মির বিকিরণ মাটির উপরি ভাগের সবকিছু ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু সব সময় মঙ্গলের পরিবেশ এমনটা ছিল না। সাড়ে ৩০০ কোটি বছর কিংবা তারও আগে সেখানে পানি প্রবাহ ছিল। বিভিন্ন যেসব খাড়ি দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, তার ছাপ এখনো গহ্বরের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। ক্ষতিকর বিকিরণ ঠেকানোর জন্য আবহাওয়া মণ্ডলে কার্বনডাই অক্সাইডের ঘন আস্তরণও ছিল। প্রাণের অস্তিত্বের জন্য যেহেতু পানি গুরুত্বপূর্ণ, তাই মনে করা হয় মঙ্গল গ্রহে একসময় জীবন ছিল। মঙ্গলের মাটিতে এখনো কোনো প্রাণের লক্ষণ আছে কি না, তা দেখতে ১৯৭০-এর দশকে ঐ গ্রহে ভাইকিং নামে একটি মহাকাশ মিশন পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের ফলাফল কিছু প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। কিউরিওসিটি রোভার ২০১২ সালে মঙ্গলে অবতরণ করেছিল এবং গহ্বরের যে অংশে সেটি নেমেছিল, সেটি একসময় পানিতে ভরা ছিল এবং দেখেছিল যে সেখানে জীবনের অস্তিত্ব থাকার উপকরণ রয়েছে। ঐ রোভার এমন জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছিল যাতে জীবনধারণের উপযোগী কার্বন রয়েছে। এখন পারজিভারেন্স তার অতি উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্র সরঞ্জাম দিয়ে একই ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষার কাজ চালাবে আগামী দুই বছর।
