মহামারি করোনা ভাইরাসের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হলের তালা ভাঙেন তাঁরা। পরে একে একে সবকটি হলের তালা ভাঙা হয়। তবে তালা ভাঙার পরপরই ছাত্রীদের হলগুলোতে আবার নতুন তালা লাগিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট হল কর্তৃপক্ষ।
এর আগে, সকাল ১০টা থেকে হল খুলে দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাদদেশে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী জড়ো হন। বেলা ১১টায় সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সড়ক ঘুরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান তাদের দুটি দাবি মানার ঘোষণা দিলেও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ছাড়া আবাসিক হল খোলা সম্ভব নয় বলে জানান। এ ঘোষণার পর দুপুর ১২টায় সেখান থেকে মিছিল সহকারে আবাসিক হলগুলোর দিকে যান শিক্ষার্থীরা।
আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবি ছাড়াও শিক্ষার্থীদের অন্য দুটি দাবি হলো—স্থানীয়দের হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিত্সার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গেরুয়ার সংযোগস্থলে স্থায়ী গেট নির্মাণ ও হামলাকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।
গতকাল গেরুয়ার এক যুবক ক্যাম্পাসের রাস্তা ধরে মোটরসাইকেলযোগে যাওয়ার সময় তাকে আটকান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাকে বেধড়ক মারধর ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন শিক্ষার্থীরা। পরে আহত অবস্থায় ঐ যুবককে গেরুয়া এলাকায় পাঠিয়ে দেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েক জন নেতা। এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে গেরুয়া এলাকায় শতাধিক পুলিশ টইল দিচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনেও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হামলার ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ১৬ মার্চ ২০২০ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের জরুরি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীদের প্রবেশ এবং সব ধরনের অনুষ্ঠান ও জমায়েত নিষিদ্ধ’ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে। এমতাবস্থায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মিছিল, জমায়েত, আবাসিক হলের তালা ভাঙা সিন্ডিকেটে গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপন্থি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী গেরুয়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। শুক্রবার রাতে গেরুয়ার লোকজন যেভাবে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আবার হামলা চালাবে না তার নিশ্চয়তা কি? তাই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলে দেওয়াসহ তিন দফা দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হল খুলে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তাই আমরা নিজেরাই হল খুলে ভেতরে প্রবেশ করছি।
আবাসিক হল খোলার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোতাহার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, হল খোলার বিষয়টি আসলে আমাদের হাতে নেই। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত এলে তবেই হল খোলা সম্ভব। আজকে উপাচার্যদের সঙ্গে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সভা রয়েছে। আশা করি সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল খোলা না খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল ও সাংস্কৃতিক জোট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে এবং হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে। ঢাকা উত্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আব্দুল্লাহিল কাফি জানান, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। শুক্রবারের সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন গেরুয়া বাজারে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৩৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। এ সময় স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের পাঁচটি মোটরবাইক ভাঙচুর করেন।
