অদম্য কৌতূহলের বিস্ময়যাত্রা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:২১

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং প্রায়শই একটি কথা বলিতেন—মানবজাতি যদি তাহার অস্তিত্ব টিকাইয়া রাখিতে চাহে, তবে তাহাকে পৃথিবীর বাহিরে কোনো অনুকূল ভিনগ্রহে পাড়ি দিতেই হইবে। তিনি মনে করিতেন, পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, পরমাণু যুদ্ধ বা জিনগত প্রকৌশলের মাধ্যমে সৃষ্ট ভাইরাস বা অন্য যে কোনো ভয়ানক কোনো বিপদে এখানে নিঃশেষ হইয়া যাইতে পারে প্রাণের অস্তিত্ব। সুতরাং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় মহাবিশ্বে নূতন বাসস্থানের সন্ধান করা কর্তব্য।

কিন্তু সেই জায়গাটি নিশ্চয়ই মঙ্গলগ্রহ নহে। মঙ্গলগ্রহ একসময় প্রাণের বসবাসের উপযুক্ত ছিল বলিয়া অনুমান করা হয় বটে। তবে উহা এখন রবীন্দ্রনাথের গানের মতো ‘নাই, রস নাই, দারুণ দহনবেলা’। মঙ্গল আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ। তবে আলোকবর্ষের দূরের ভিনগ্রহে পাড়ি জমাইবার পূর্বে প্রতিবেশীদের আঙিনায় বারবার পা রাখাটা মানবজাতির জন্য এখনো খুব সহজ নহে। নাসার মহাকাশযান পারসিভেয়ারেন্স মহাশূন্যে সাড়ে ৫ কোটি কিলোমিটার পথ সাঁতরাইয়া গত শুক্রবার মঙ্গলে পাড়ি জমাইয়াছে। মঙ্গলের বলয়ে পৌঁছাইয়া সাত মিনিটের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর পারসিভেয়ারেন্সের রোবট সফলভাবে মঙ্গল গ্রহের বুকে অবতরণও করিয়াছে। ইতিমধ্যে রোবটটি মঙ্গল হইতে ছবিও পাঠানো শুরু করিয়াছে। দুই বত্সর ধরিয়া রোবটটি বুঝিবার চেষ্টা করিবে, মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না! এখন তাহার কী অবস্থা? কীভাবে একদা জলের অস্তিত্ব থাকা মঙ্গল এমন শুষ্ক পাথুরে লালগ্রহে পরিণত হইল। ইহা হইতে শুধু মঙ্গল নহে, পৃথিবীরও জন্মরহস্য অনেকটাই নাকি বোঝা যাইতে পারে! কারণ পৃথিবীর আদি অবস্থার সহিত মঙ্গলের আদিপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মিল রহিয়াছে।

মানবজাতি নাকি আফ্রিকা হইতে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ইহার কারণও নূতন ও অজানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ বলিয়া মনে করা হয়। মানুষ অদম্য কৌতূহলী প্রাণী। মানুষ তাহার কৌতূহলের সাহসী তরি ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড, স্থাপন করিয়াছে নূতন উপনিবেশ। বিভিন্ন সময় কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, আমেরিগোসহ অসংখ্য অভিযাত্রী অংশ লইয়াছে এই দুঃসাহসিক অভিযানে। মানুষের এই অদম্য মানসিকতাই তাহাকে আকাশে উড়াইতে পারিয়াছে, সশরীরে লইয়া গিয়াছে রূপকথার চাঁদের দেশে। সেই অদম্য দুঃসাহসেরই অংশ এই সকল মঙ্গল অভিযান। সৌরজগতের ভিতরকার কোনো একটি গ্রহে পা রাখিবার এই সকল অভিযান সফল হইলে মানুষ অদূর ভবিষ্যতে পা বাড়াইবে সৌরজগতের বাহিরের কোনো সবুজ গ্রহে, যাহা এখনো অনাবিষ্কৃত। যদিও, কেবল পারসিভেয়ারেন্স নহে, মঙ্গলে সফল অভিযান খুব সহজ কাজ নহে। দেখা গিয়াছে, মঙ্গলগ্রহে যত অভিযান হইয়াছে তাহার প্রায় অর্ধেকই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। কিন্তু কেন? তাহার প্রধান কারণ আমাদের প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। অর্থাত্ মানবজাতি যত নিজেদের জ্ঞান ও প্রযুক্তি লইয়া গর্ব করুক না, বাস্তবে প্রতিবেশীর আঙিনায় পা রাখিতেই আমাদের দম বাহির হইবার উপক্রম হয়। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিতেই পারে, প্রতিবেশীর আঙিনায় পা রাখিতেই যদি এমন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়, তাহা হইলে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের ভিনগ্রহে পাড়ি দেওয়া তো মহাশূন্যের মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়া। সেই কাজ মানবজাতির পক্ষে কী করিয়া সম্ভব হইবে?

বিজ্ঞান বিবর্তন ও বিকাশ দেখিয়া অনুমান করা যায়, একদিন নিশ্চয়ই উহা সম্ভব হইবে। এই তো মাত্র গ্যালিলিওয়ের সময়ও আমরা মনে করিতাম, পৃথিবীই এই বিশ্বের কেন্দ্র। শামিয়ানা টাঙানো পৃথিবীর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্ররা জোনাকির অতি ক্ষুদ্র আলো মাত্র। সুতরাং মানবজাতির জ্ঞানের বিকাশের ক্রমধারা আমাদের আশা জাগাইতেই পারে।