ভাবতে ভালোই লাগে যে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিবর্তনের সুবাতাস বইছে। মানুষের জীবনের এমন কোনো পর্যায় নেই, যেখানে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। তথ্যপ্রযুক্তির উত্কর্ষ সাধনের ফলে আমাদের জীবনে শ্রম লাঘব হয়েছে, দূরত্ব ঘুচেছে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। নিঃসন্দেহে তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার রয়েছে, তেমনি এই তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হচ্ছে এক নতুন ধরনের অপরাধ, যার নাম সাইবার অপরাধ। তথ্যপ্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে উপজীব্য করে অসাধু মহল সমাজে সাইবার অপরাধ নামের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার ঘটিয়ে যাচ্ছে।
সাইবার অপরাধ একটি বাউন্ডারিলেস ক্রাইম। কারণ এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে এক দেশে বসে অপরাধ সংঘটন করে আরেক দেশের নাগরিকদের ভিকটিম বানানো সম্ভব। তাই প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সাইবার ক্রাইম। আমাদের দেশে এই সাইবার অপরাধের বেশির ভাগ ভিকটিম হয় নারীরা। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০১৯ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের চেয়ে ২০১৯ সালে সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগী নারীর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে ভুক্তভোগী নারীর হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যেটা ২০১৮ সালে ছিল ৫১ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ) সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বরর যাত্রা শুরু করে এখন পর্যন্ত বিশেষ ইউনিটের হটলাইনে ৫ হাজারেরও বেশি সাইবার অপরাধের শিকার নারী কল করেছেন। এর মধ্যে ফেইক ফেসবুক আইডি-সংক্রান্ত অভিযোগ ২৩ শতাংশ, আইডি হ্যাক-সংক্রান্ত ১৩ শতাংশ, ব্ল্যাকমেইলিং-সংক্রান্ত ৮ শতাংশ, মোবাইল হ্যারাজমেন্ট-সংক্রান্ত ৯ শতাংশ, অশ্লীল কনটেন্ট পাঠানোসংক্রান্ত ৭ শতাংশ, অন্যান্য ৯ শতাংশ এবং অপ্রাসঙ্গিক অভিযোগ আসে ২৭ শতাংশ। একটি বিষয় পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের সাইবার অপরাধীদের মূল টার্গেট নারী সমাজ এবং বেশির ভাগ ভুক্তভুগীর বয়স থাকে ১৮-৩০ বছরের মধ্যে।
এখন যে প্রশ্নটিতে আলোকপাত করা প্রয়োজন তা হলো, আসলে এই ভুক্তভোগীর মধ্যে কত জন আইনের আশ্রয় নেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, সাইবার অপরাধে আক্রান্ত ৭ শতাংশ ভিকটিম অভিযোগ দায়েরের জন্য আইনের দ্বারস্থ হন; ৫৪ শতাংশ ভিকটিম পুলিশের প্রতি নারাজ; ৪৪ শতাংশ মনে করেন, দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে যদি সঠিক আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হতো; ২৩ শতাংশ ভিকটিম পুনরায় যৌন হয়রানির ভয়ে আইনের দ্বারস্থ হতে ভয় পান; ২৩ শতাংশ ভিকটিম পত্রিকায় ছাপা হওয়ার ভয়ে আইনি সহায়তা নিতে ভয় পান; ১৭ শতাংশ ভিকটিম তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে সাইবার হয়রানি সম্পর্কিত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে চান না; ৩০ শতাংশ ভিকটিম জানেনই না অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কীভাবে আইনি সহায়তা পেতে পারেন; ২৫ শতাংশ ভিকটিম কোনো ইতিবাচক ফল আসবে না বিধায় কোনো অভিযোগ করতেই চান না।
এবার আসা যাক আইন প্রসঙ্গে। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেনাল কোড, ১৮৬০ প্রভৃতি আইন রয়েছে বটে; কিন্তু যেহেতু অপরাধটা প্রযুক্তিনির্ভর এবং প্রযুক্তির উত্কর্ষতা সাধনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনেও আসছে পরিবর্তন, তাই এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলার আইনেও আসতে হবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রণীত আইনের দিকে লক্ষ করলেই আমরা দেখব যে, আমাদের আইনটি আরো কত যুগোপযোগী এবং পরিবর্তন করা দরকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সাইবার অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা এই মুহূর্তে মাত্র একটি, যার কারণে সারা দেশের মামলা একটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ফলে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। দুরদুরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য মামলা চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। সেই জন্য অবশ্যই বিভাগীয় পর্যায়ে দ্রুত সাইবার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে সেখানে যোগ্য প্রসিকিউটর নিয়োগ দিতে হবে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায় আসলে সবার। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সবার সম্মিলিত দৃঢ় প্রতিরোধই পারে এই অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করতে।
n লেখক :শিক্ষক, আইন বিভাগ, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়
