প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভাষা মানুষের পরিচয়। এ পরিচয় মানুষকে সম্মানিত করে। আমরা রক্ত দিয়ে সেই সম্মান অর্জন করেছি। বাংলা ভাষা আমাদের গৌরবময় অর্জন। গতকাল রবিবার মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২১ উদ্বোধন এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০২১ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এবছর প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। মাতৃভাষা সংরক্ষণ, চর্চা ও প্রচার-প্রসারে অবদান রাখায় জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ তিন ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এ পদক। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি পদক তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে কোনো একটি জাতির জন্য ভাষাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মায়ের ভাষায় শিক্ষা নিতে পারা এবং মায়ের ভাষায় কথা বলতে গেলে সহজে আমরা শিখতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ধীরে ধীরে অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। তার পরও বিশ্বব্যাপী ভাষার যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা সংরক্ষণ, তার চর্চা এবং বিকাশ একান্তভাবে প্রয়োজন।’ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বজায় রেখে ভাষার চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর অবদান ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু সত্যকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘যার নেতৃত্বে এই ভাষা আন্দোলনের শুরু, আর ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। ভাষা আন্দোলন থেকেই তিনি বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। এবং তারই নেতৃত্বে আমরা বিজয় অর্জন করি, স্বাধীন রাষ্ট্র পাই, স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাই।’
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে এবার সশরীরে শহিদ মিনারে যেতে না পারায় আক্ষেপও প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। এই অনুষ্ঠানেও সশরীরে উপস্থিত হতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে যখন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাহেবের হাতে পদক তুলে দেওয়া, এটা যে আমার জন্য কত সম্মানের এবং গৌরবের, কিন্তু আমার দুঃখ এখানে যে আমি নিজের হাতে দিতে পারলাম না।’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্যার, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি করোনা ভাইরাসের কারণে আসলে... প্রধানমন্ত্রী হলে সব স্বাধীনতা থাকে না। অনেকটা বন্দি জীবন যাপন করতে হয়। সেই রকমই আছি। কারণ আমি এক জায়গায় যেতে গেলে আমার সঙ্গে বহু লোক। নিরাপত্তার লোক, অমুক লোক-তমুক লোক, প্রায় হাজারখানেক লোককে রাস্তায় দাঁড় করায়, নানাভাবে তাদের কাজে লাগায়। তাদের কথা চিন্তা করেই কিন্তু আমি আসতে পারিনি। তবু আমি অভিনন্দন জানাই আপনাকে।’ একই সঙ্গে অন্যান্য যারা পুরস্কার পেয়েছেন তাদের প্রতিও আন্তরিক অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে ক্যাটাগরি-দুইয়ে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়ার জন্য ইউনেস্কোকেও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় ক্যাটাগরিতে অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ছাড়াও খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা এই পুরস্কারে ভূষিত হন। আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে উজবেকিস্তানের নাগরিক ইসমাইলভ গুলম মিরজায়েভিচ ও বলিভিয়ার অনলাইনভিত্তিক সংগঠন অ্যাক্টিভিজমো ল্যাঙ্গুয়াজ এই পুরস্কারে ভূষিত হন।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম জাতীয় পর্যায়ে মাতৃভাষার সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও বিকাশে অবদানের জন্য ২০২১ সালের এ সম্মাননা পেলেন।
জাতীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণে অবদানের জন্য খাগড়াছড়ির জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, উজবেকিস্তানের নাগরিক ইসমাইলভ গুলম মিরজায়েভিচ তার মাতৃভাষার গবেষণায় অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। লাতিন আমেরিকার স্থানীয় ভাষাগুলোকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে বলিভিয়ার অ্যাক্টিভিজমো লেংকুয়াস।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির পরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। এছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ঢাকায় নিযুক্ত ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর মিস বিয়েট্রিস খালদুন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রান্তে শিক্ষা উপমন্ত্রী মজিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
