গল্পকথায় পদার্থবিজ্ঞান

নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, ব্ল্যাকহোল

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:২৭

গতকালের পর

১৯৬৭ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা টিম সর্বপ্রথম নিউট্রন নক্ষত্রের পালসার আবিষ্কার করেন। নক্ষত্রের ভর ১.৫থেকে ৩ সৌরভরের মধ্যে থাকলেই কেবল তা নিউট্রন নক্ষত্র বা পালসার হতে পারে। নক্ষত্রের ভরের এই সীমাকে টোলম্যান-ওপেন হাইমার-ভলকফ সীমা (TOV Limit) বলা হয়।

আকাশ বলল-ভর যদি আরও বেশি হয়,  ৩ সৌরভরের চেয়ে বেশি, তখন?

নীলকান্তবাবু বললেন- ৩ সৌরভরের চেয়ে বেশি হলে মূলবস্তু অনির্দিষ্টভাবে সংকুচিত হতে থাকে কিন্তু ভর তো কমে না। ফলে এর ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়। এ অবস্থায় এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়। ফলে মুক্তিবেগও খুব বেশি হয়ে যায়। মুক্তিবেগ তোমাদের মনে নেই?

-হ্যাঁ, মনে আছে, বলল চন্দ্রা। যে বেগে কোনও বস্তুকে নিক্ষেপ করা হলে তা আর ফিরে আসে না, সেই বেগকে বলে মুক্তিবেগ।

ঠিক তাই। বললেন-নীলকান্তবাবু। মুক্তিবেগ বাড়তে বাড়তে আলোর বেগের চেয়েও বেশি হয়ে গেলে সেখান থেকে ফোটনও বেরিয়ে আসতে পারে না। তখন একে বলা হয় কৃষ্ণবিবর বা ব­্যাকহোল।

অর্থাত্ কৃষ্ণবিবরকে চোখে দেখা যাবেই না, আকাশের মন্তব্য।

হ্যাঁ, বললেন নীলকান্তবাবু, চোখে দেখা যাবে না, তবে এর মহাকর্ষ আকর্ষণ অনুভব করা যাবে। কৃষ্ণবিবর বা

ব্ল­্যাকহোলের অঞ্চল থেকে কোনও তথ্যই পাওয়া সম্ভব নয়। এই অঞ্চলের সীমাকে বলা হয় ঘটনাদিগন্ত। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী র্কাল সোয়ার্জস্কাইল্ড কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধের রাশিমালা নির্ণয় করেন। তাঁর নামানুসারে একে বলা হয় সোয়ার্জস্কাইল্ড ব্যাসার্ধ।

এই ব্যাসার্ধ কত হতে পারে? বলল আকাশ।

তা ধরো ৫ সৌরভরের কোনও কৃষ্ণবিবরের ব্যাসার্ধ হতে পারে ১৫ কিলোমিটার। অর্থাত্ ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও কিছু দেখা যাবে না, তবে মহাকর্ষ আকর্ষণের মাধ্যমে উপস্থিতি অনুভব করা যাবে।

ব্ল­্যাকহোল কি স্টিফেন হকিং আবিষ্কার করেছিলেন? কমলার প্রশ্ন।

না, বললেন নীলকান্তবাবু। ব­্যাকহোলের ধারণা অন্তত দুইশ বছর আগের। ১৮৮৩ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিচেল ব­্যাকহোলের ধারণা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেন। তবে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান বিজ্ঞানী জন হুইলার ব্ল্যাকহোল নামকরণ করেন।

কিন্তু স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে কী বলেন? প্রশ্ন করলেন কমলা।

হ্যাঁ, ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং অন্য কথা বলেন। বিজ্ঞানীরা ভাবতেন ব্ল্যাকহোলই মৃত নক্ষত্রের অন্তিম দশা। ব­্যাকহোল থেকে কোনও বিকিরণ বের হতে পারবে না। কিন্ত হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে বলেন, ব্ল­্যাকহোলকে পুরোপুরি কালো বলা যাবে না। কারণ ব্ল্যাকহোল ঘটনা দিগন্তের কিনারা থেকে খুব সামান্য হলেও ফোটন, নিউট্রিনো বিকিরণ করে এবং ভর সম্পূর্ণ না হারানো পর্যন্ত এই বিকরণ চলতেই থাকবে। তাঁর নামানুসারে একে বলা হয় হকিং বিকিরণ।

রেখা এতক্ষণ নিরব ছিল। তার পানিফল ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। সে বলল-বাবা, আমাদের সূর্যও কি ব্ল্যাকহোল হবে?

নীলকান্তবাবু বললেন-সূর্যের ব্যাসার্ধ কমতে কমতে যদি ৩ কিলোমিটার হতে পারে, তখন এটি ব্ল্যাকহোল হতে পারে। তবে আমাদের সূর্যটা কখনোই ব্ল্যাকহোল হবে না। কারণ ব্ল্যাকহোল হতে গেলে এর ভর ৩ সৌর ভর হতে হবে।

রেখা বলল-তাহলে ভালোই হলো, আমরা ব্ল্যাকহোলের ফাঁদে পড়ব না।

নক্ষত্রের গল্প শেষ করে নীলকান্তবাবু বললেন-পানিফল তোমাদের কেমন লেগেছে?

খুব চমত্কার। বলল সবাই।

এটি আমাদের দেশীয় ফল। আরেকদিন কি কিনে আনব?

অবশ্যই। বলল সবাই।