নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার আগে নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। নারীর ক্ষমতায়ন নারীদের ব্যক্তিজীবন, সমাজ এবং সম্প্রদায়-সংস্কৃতিতে মতপ্রকাশ, অধিকার লাভ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ লাভ করে। মূলত নারীর ক্ষমতাকে এককভাবে দৃশ্যায়িত করা কঠিন। ক্ষমতায়ন এমন একধরনের প্রক্রিয়া যা শুধু উপলব্ধি করা যায়! কবি-সাহিত্যিকরা হয়তো তাদের অন্তর্দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে পান। কিন্তু বাস্তবভিত্তিক কার্যপরিকল্পনায় এটি মাইন্ডগেমের মতো প্রবাহমান প্রক্রিয়া।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় সর্বোত্তম ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার। কোনো সমস্যার সমাধান গোড়া থেকেই শুরু করা হলে সেই সমস্যার ঘা শুকিয়ে শিখরে পৌঁছাতে বেশি দিন সময় লাগে না। কিন্তু আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থা নড়বড়ে। আমাদের সমাজে জন্মের পর থেকে মেয়েদের ভিন্ন চোখে দেখা হয়। সেখানে বেড়ে ওঠা ছেলে শিশুটিও একদিন যুবকে পরিণত হয়ে সেই দৃষ্টিকোণ লালন করতে থাকে। একজন মেয়েকে ক্ষমতা প্রদানের লক্ষ্যে প্রথমত কাজ করা উচিত তার পিতা-মাতাকে। তবু সরকার দায়ভার নেয়! একটি শিক্ষিত, বৈষম্যহীন সমাজ প্রাপ্তি সবার কাম্য। কিন্তু সেই সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করার মতো মানুষের বড় অভাববোধ আমাদের কুরে খাচ্ছে।
এ দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। চীন তাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করেছে। অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রগুলোও নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এটা নির্ভর করে না, সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একজন নারী নাকি পুরুষ! এটা নির্ভর করে সে দেশের জনগণ নারীর প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে! সে ক্ষেত্রে একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে উন্নয়ন কল্পনাতীত। এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি অনেক সংস্থাই কাজ করছে। ইতিমধ্যে অনেক আইনও প্রণয়ন হয়েছে। ১৯৬৭ সালে মহিলা লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নারীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ করে দেন। কিন্তু পরিবারের বেড়ি পেরিয়ে অত্যন্ত নগণ্যসংখ্যক নারীই পেরেছিলেন তখনকার মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করতে। নারীর ক্ষমতায়নে নিরলস কাজ করা পরিশ্রমী নারী কর্মীকে স্বীকৃতি স্বরূপ গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ, প্ল্যানেট ফিফটি, ফিফটি চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জ প্রভৃতি পুরস্কারে ভূষিত করা হচ্ছে। তবু বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। নারী ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক উপস্থিতি একটি বিশেষ সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী নারীদের একক জাতীয় সংসদে অধিষ্ঠিত হওয়ার গড় মাত্র ২.৬ শতাংশ। কিন্তু বিগত চার বছরে এই সংখ্যা আরো বেড়েছে। এই সংখ্যায় ক্ষমতার কম পড়ে গেলেও বর্তমানে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে বিশ্বের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে বাংলাদেশ অষ্টম হলেও এ দেশে নারী নির্যাতন বন্ধ হয়নি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, যৌতুকপ্রথা বন্ধ হয়নি।
নারীর ক্ষমতায়নে শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপদান। প্রাথমিক পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার ৯৯.৪ শতাংশ কিন্তু মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চতর শিক্ষায় সমানুপাতিক হারে কমতেই থাকেই। এর পেছনে কাজ করে দারিদ্র্যতা, ধর্মীয় প্রভাব, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি। নারী দারিদ্র্যতা কমাতে সরকার ভিজিডি, ভিজিএফ, দুস্থ ভাতা, মাতৃত্বকালীন ও গর্ভকালীন মায়েদের ভাতা, অক্ষম মা ও তালাকপ্রাপ্তদের ভাতা, কাজের বিনিময়ে খাদ্য সুযোগ, প্রতি ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি সুযোগ দিয়ে বৈষম্য বা ভেদাভেদ দূরীকরণের চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, গৃহ ব্যবসা, বহুমুখী প্রকল্প, প্রতি বাড়িতে খামার তৈরিতে সরকারি অনুদানে নারীদের পিছিয়ে পড়া হতে তুলে আনতেই এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আমাদের দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী বছরেই নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে সংবিধান প্রণীত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশত বছরেও সেই সমতা প্রতিষ্ঠা হয়নি। প্রথম থেকেই সমতার লক্ষ্যে পারিবারিক শিক্ষা থাকলে বর্তমান প্রজন্মে নারী অধিকার নিয়ে আলাদাভাবে ভেবে বুদ্ধিক্ষয় করতে হতো না। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায়, নারী ক্ষমতায়নে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা কিংবা অধিকার-হুকুম খাটানোর রীতি দমন করা জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের প্রাপ্য ফিরিয়ে দিলে বিশ্বের কাছে হয়ত একদিন এদেশ রোল মডেল হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
